৯ মাসে ১০৩ খুন
নারায়ণগঞ্জে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ১০৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অভিযোগ উঠেছে। গতমাসে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুন হয়েছেন দুই যুবদল নেতা। এদিকে চলতি বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ১০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো রয়েছে বলে দাবি করেছেন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান।
গত ১২ অক্টোবর সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের আটি ওয়াপদা কলোনীতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে জানিয়েছিলেন পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সাহেব আলীকে গুলি করে হত্যা করেন তার প্রতিপক্ষের লোকজন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলিবিদ্ধ হয়ে সাহেব আলী সড়কের পাশের একটি খালে পড়ে যান। সেখানেও তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়। জহির আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছিলেন। জহির ফকিরের স্বজনদের অভিযোগ, আসন্ন কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা নিয়ে স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতার সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলছিল। এর আগে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর ওপর হামলাও হয়েছিল বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা। এর আগে ২০ মে রাত পৌনে ১টার দিকে আড়াইহাজারের দুপ্তারা ইউনিয়নের পাঁচগাঁও চরপাড়া এলাকার কাউন্দার চকে অবৈধভাবে ভেকু দিয়ে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনিকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ১০৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সাতটি। এদিকে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ২১২টি চুরি, ৬৭টি ছিনতাই ও ৩৮টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ১ হাজার ৪২৬টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ২৭০টি মামলা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই পুলিশ ও এসআরবি সদস্যদের লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
তারপরও আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।” আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রসহ মোট ১৫৩টি অস্ত্রের মধ্যে ১১৮টি উদ্ধার করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। যদিও রাজধানীর পাশের এ শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কমিশন ঢাকা দক্ষিণের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম। বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হবে, এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ নেই বলেও মনে করেন। মাসুমের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধের ঘটনাগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ করতে পারছে না।
আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও বাইরে থাকা অপরাধীদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার দাবি, কার কাছে কী ধরনের অস্ত্র রয়েছে, কারা সেগুলো ব্যবহার করছে এবং কোথায় কীভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে- এসব বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনকারীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে থানাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।” স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


