নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় ‘বায়তুল আমান ভবন’ ভাঙা
১৯ মাস যাবৎ আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দিন কাটাচ্ছেন সেই বিধবরা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
১৯ মাস যাবৎ আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দিন কাটাচ্ছেন সেই বিধবরা
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে হামলার পর শেখ পরিবারের রাজনীতি ও ওসমান পরিবারের রাজনীতি সমপর্যায়ের এটা বুঝাতেই শামীম ওসমানের স্ট্যান্টবাজির অংশ হিসেবেই গত ২০২৫ সালের (৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় চাষাঢ়ায় শামীম ওসমানের সৎ চাচা-চাচিদের বসবাসকৃত ‘বায়তুল আমানে’ হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। ভেকু নিয়ে বাড়ির অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে দেওয়া হয়। আলোচিত ওসমান পরিবারের সম্পৃক্ততা খুব বেশি ছিল না। যাদের সাথে ওসমান পরিবারের সম্পৃক্ততা খুব বেশি ছিল না।
এদিকে নারায়ণগঞ্জবাসীর জীবন নাজেহাল করা শামীম ওসমান পরিবার নিয়ে বিদেশে বিলাসী জীবন যাপন করলেও ওসমান পরিবারের হয়ে ও বঞ্চিত থেকে জীবনযাপন করা তাদের সৎ বংশের চাচিরা বুলডোজারের চাপে পিষ্ট করা হয়। এদিকে গত ১৯ মাস যাবৎ বিগত দিনে বাড়িতে থাকা ৪ বিধবা মহিলা নিদারুণ কষ্টে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন্ আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে দিন কাটাচ্ছেন। এমনটাই জানিয়েছে পরিবার সূত্র।
তা ছাড়া তারা আরো জানিয়েছেন, যে রাস্তা বড় করার স্বার্থে যদি সরকার উপযুক্ত মূল্য দিয়ে জায়গাটি অধিগ্রহণ করে তাহলে তারা প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে অন্যত্র বসবাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এদিকে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি ভুক্তভোগী পরিবারের এমন বার্তায় সমর্থন জানিয়ে নিজ ফেসবুকের ওয়ালে লিখেছেন, সরকার উপযুক্ত মূল্য দিয়ে জায়গাটি অধিগ্রহণ করলে রাস্তা বড় হিসেবে নগরবাসীর উপকার পাবে এবং অধিগ্রহনের টাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর শামীম ওসমানের আসন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান শামীম ওসমানের চাচা শফিউদ্দিন সারায়োর ওরফে বাবু সারোয়ারের সাবেক স্ত্রী প্রয়াত চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী। ওই সময় ৫ বছর এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করলেও এক মুহুর্তের জন্য শামীম ওসমান ও তার ভাইয়েরা তাকে শান্তিতে কাজ করতে দেননি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভায় দেখা গেছে,শামীম ওসমান প্রকাশ্যেই তার চাচী সারাহ বেগম কবরীকে লাঞ্ছিত করেন। কবরীর স্বাভাবিক কাজকর্ম যাতে বিঘ্নিত হয় এ কারণে শামীম ওসমান তাঁর ক্যাডার বাহিনীকে তার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। ওই সময় চাচাদের সাথে শামীম ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়ের সাপে-নেউলে সম্পর্ক দেখেছেন নারায়ণগঞ্জবাসী। শামসুজ্জোহার উত্তরসূরীরা নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে এক দানবীয় সত্ত্বার মানুষ হিসেবে পরিচিতি ছিলেন, এখনো আছেন। সেখানে শামসুজ্জোহার ভাইদের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জবাসীদের কখনোই কোন ক্ষোভ ছিল না।
এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন তিনি। সরকার পতনের আগেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি এ কে এম সেলিম ওসমান, আওয়ামী লীগ নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি এ কে এম শামীম ওসমান, সাবেক এমপি নাসিম ওসমানের (প্রয়াত) ছেলে আজমেরী ওসমান এবং শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমান প্রাণ বাঁচাতে সপরিবারে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যান। এ ছাড়া পালিয়ে যায় তাদের দোসর গত ১৬ বছর ধরে এলাকায় নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ নানা অপকর্মে জড়িতরা।
সরকার পতনের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা জামতলায় শামীম ওসমানের বাড়ি, উত্তর চাষাঢ়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়ি হিরা মহল, চাষাঢ়া মোড়ে বায়তুল আমান, চাষাঢ়া মোড়ে রাইফেল ক্লাবে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তবে শামীম ওসমানের দাদা খানসাহেব ওসমান আলীর ‘বায়তুল আমান’ অক্ষতই ছিল। বায়তুল আমানে লোকজন হামলা চালাতে গেলে সে সময় বাড়ির বাসিন্দারা জানান, শামীম ওসমান পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই।
এ ভবনের দেয়াল সে সময়ে ভাঙা হলেও বাড়ির বাসিন্দারা পরে দেয়াল মেরামত করেন ও বারান্দার অংশে রং করেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে হামলার পর ৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চাষাঢ়ায় বায়তুল আমানে হামলা চালানো হয় তা নিয়েও নানা রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া সেখান থেকে হামলাকারীদের একটি অংশ উত্তর চাষাঢ়ায় গেলেও হিরা মহল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়নি। তা নিয়ে ও নানা প্রশ্ন নগরবাসীর মনে।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ইউটার্ন নেন টিপু। ওসমান পরিবারের সাথে সখ্যতা নেই এটা প্রমাণ করতে করতে ৫ আগস্টের পর শামীম ওসমানদের পুরো বাড়ি হীরা মহল, সেলিম ওসমানের বাড়িতে টিপুর নেতৃত্বে ভাঙচুর-হামলা চালানো হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় ৫ আগস্টের পর ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতা আবারও প্রমাণ হয় বায়তুল আমান ভবন ভাঙার বিষয়টি নিয়ে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সাথে মিল রেখে শামীম ওসমানের উপর বোমা হামলা, শেখ হাসিনা উপর আক্রমণের সাথে মিল রেখে শামীম ওসমানের উপর আক্রমণের ঘটনা এটি শামীম ওসমানের রাজনৈতিক ট্রেন্ড হিসেবে পরিচিত।
৫ আগস্টের পর যখন ধানমন্ডি ৩২নং বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর চালানো হল, শামীম ওসমান না থাকলেও টিপুর নেতৃত্বে ওই ঘটনার পর আওয়ামীলীগের ঐতিহ্য জন্মবাড়ি দাবি করা ‘বায়তুল আমানে’ হামলা ভাঙচুর করে বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়। অথচ এই বাড়িতে যারা বসবাস করতো শামীম ওসমানের চাচার পরিবার তাদের সাথে কখনোই শামীম ওসমান, সেলিম ওসমানের ভালো সম্পর্ক ছিলনা। বিএনপির একটি বুদ্ধিজীবী অংশ মনে করে, শামীম ওসমানের নির্দেশেই টিপু ‘বায়তুল আমান’ ভবন ভেঙেছিলেন।
যাতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ভবিষ্যতে শামীম ওসমান দেখাতে পারে, ধানমন্ডি ৩২ ভাঙার পর নারায়ণগঞ্জের বায়তুল আমান ভাঙা হয়েছিলো। শামীম ওসমানের রাজনীতি শেখ পরিবারের রাজনীতির সমপর্যায়ের। অথচ বায়তুল আমান ভাঙার পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাস্তবিক অর্থে একটি নিরীহ বিধবা পরিবারের সদস্যরা। এতে মূলত টিপুর মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে খাচ্ছেন শামীম ওসমান।


