Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

চিহ্নিত অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

চিহ্নিত অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া

চিহ্নিত অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া

Swapno



নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির ফলে খুন, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভূমিদুস্যতা, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, ঝুট ব্যবসার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষের মতো অপরাধের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ট্যাগ ব্যবহার করে অপকর্ম করে ও পার পাচ্ছেন অপরাধীরা। এর পাশাপাশি শহরের এলাকাগুলোর মাদকের তীব্র চক্রে জড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সোর্সের যোগসাজশে এখানে মাদক ব্যবসা দেদারসে চলছে।


ইতিমধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছায়াতলে থেকে প্রশাসনকে পাত্তা না দিয়ে তাদের উপরে ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরছেন অনেকেই। বর্তমানে জেলায় নতুন এসপি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মাদক ব্যবসায়ীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বর্তমানে নিয়মিত নানাভাবে অভিযান চলমান রয়েছে। তা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলায় গত ৮ মাসে ১১ বার পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমতা অবস্থায় প্রশাসনের নিরব ভূমিকা অনেকটাই লক্ষ্য করা গেলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের উপর হামলার ঘটনা নেই বললেই চলে।


সূত্র জানিয়েছে, শহরের মাদক ব্যবসার প্রভাব বিস্তার নিয়ে শুভ দাস ওরফে বিল্লালকে হত্যার অভিযোগ উঠে। শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী অনিক, রাহাত, রাহার, ইমন, মাইঈা সুমনের বিরদ্ধে। এদের বিরুদ্ধে শেল্টারদাতা হিসেবে আলোচনা উঠছে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নাম। তা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ শহরের ইসদাইর ও চাষাঢ়া রেললাইন এলাকার রাজ্জাক এবং মাসদাইরের জাহিদ। এ দুইজন এখন নারায়ণগঞ্জ শহরের দুর্ধর্ষ অস্ত্রবাজ ও মাদক কারবারীতে পরিণত হয়েছেন।


তাদের দাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পরাভূত হচ্ছে। সর্বশেষ ১৫ আগস্ট দুপুরে শহরের চাষাঢ়া রেল স্টেশন সংলগ্ন ইসদাইর সড়কে দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাজ্জাক বাহিনীর সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছে তিন পুলিশ সদস্য। এর আগে ৫ মে মাসদাইর বোয়ালিয়া খাল এলাকাতে র‌্যাবের উপর হামলা করে জাহিদ বাহিনীর সদস্যরা। তা ছাড়া পরবর্তীতে পতেঙ্গার মোড়ে ও পুলিশের উপর হামলা চালায় চিহ্নিত মাদক সন্ত্রাসীরা। তা ছাড়া ফতুল্লা কাঠেরপুল এলাকায় মাদক ব্যবসা-ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুই গ্রুপ পাল্টাপাল্টি অবস্থা উত্তেজিত অবস্থায় রয়েছে। এদিকে কাঠেরপুল এলাকায় সেই দুই বাহিনীর আস্তানায় অভিযান দিয়ে র‌্যাব-১১ বিদেশি অস্ত্রসহ উদ্ধার করেছে। এমতা অবস্থায় কাঠেরপুল, রামারবাগ এলাকা বর্তমানে টানটান উত্তেজনা। এমতা অবস্থায় প্রশাসনের জড়ালো অভিযান পরলে সেখানে ও প্রশাসনের উপর হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।


এদিকে রাজ্জাক (২ এপ্রিল) অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর ইসদাইরে মাদক বিকিকিনি কিছুটা কমে যায়। কিন্তু গত সপ্তাহে রাজনৈতিক প্রভাবে ফের জামিন পেলে উত্তাপ ছড়ায় ইসদাইরে। শুরু করে অস্ত্রের মহড়া।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে রাজ্জাক ও তার ছেলে জসিম কারাগার থেকে জামিনে বের হন। জামিনে বের হওয়ার পর তারা ইসদাইর এলাকায় পুনরায় সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়াতে পারে-এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ চাষাঢ়া রেলস্টেশন ও ইসদাইর নতুন রাস্তা এলাকায় নজরদারি জোরদার করে। ১৫ আগস্ট বিকেল সোয়া ৩টায় নিয়মিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছিল।


ওই সময়ে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাজ্জাক, তার শ্যালক ইয়াদ আলী ও ছেলে ওয়াসিমের নেতৃত্বে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চাষাঢ়া রেলস্টেশন থেকে ইসদাইর নতুন রাস্তার দিকে এগিয়ে আসছিল। তারা পুলিশের আভিযানিক দলকে লক্ষ্য করে একটি পিস্তল থেকে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে পুলিশের গুলির মুখে রাজ্জাক বাহিনীর সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ধাওয়া করে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জসিম ও মোহনকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ আটক করে। একটি গুলি জসিমের উরুতে লাগে। গোলাগুলির সময় তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।  রাজ্জাকের বিরুদ্ধে দুটি হত্যা, গুম, অপহরণ, অস্ত্র, চাঁদাবাজী সহ মোট ১২ টি মামলা এবং পুত্র ওয়াসিমের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজী মাদক,অস্ত্র সহ ৭টি মামলা রয়েছে ফতুল্লা মডেল থানায়।


তা ছাড়া ফতুল্লার মাসদাইর, ঘোষেরবাগ, গলাচিপা এলাকাতে একচ্ছত্রভাবে মাদক ব্যবসার নিয়স্ত্রক হলেন জাহিদ। দুর্ধর্ষ এ জাহিদের নেতৃত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী ও ডাকাত। তাদেরকে দিয়ে বিভিন্নস্থানে এসব অপরাধগুলো করানো হয়। তাদের একজন মনির হোসেন। কিন্তু দুর্ধর্ষ প্রকৃতির হওয়াতে নাম জুড়ে যায় ফাইটার মনির। ৬ জানুয়ারী বিকেলে ফতুল্লার গলাচিপা চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় ফাতেমা ইয়াসমিন শিল্পীর মালিকানাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশী চালিয়ে মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার জব্দ করা হয়। মাসদাইর বাজারের অপর মাদক বিক্রেতা শাওনকেও কুপিয়ে আহত করেছে এ জাহিদ।


এ অপকর্মের পর পুলিশ কিংবা র‌্যাব কেউ এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি এ মাদক ব্যবসায়ী জাহিদকে। গত বছরের ১৬ নভেম্বর মাসদাইর এলাকায় প্রকাশ্যে হামলা ও গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী জাহিদকে ধরতে র‌্যাবের তৎপরতা টের পেয়ে ছোরা গুলিতে জবা নামে একজন নারী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বিকেলে সন্ত্রাসী জাহিদকে গ্রেপ্তারে তৎপর হয় র‌্যাব-১১ এর একটি গোয়েন্দা দল। দলটি ফতুল্লার মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় পৌঁছালে জাহিদ ও তার সহযোগীরা র‌্যাবের গোয়েন্দাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছুড়ে। এসময় জাহিদের ছোড়া গুলি স্থানীয় এক বাড়ির রান্নাঘরে থাকা জবা আক্তার (২২) এর বুকে এসে লাগে। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া চলতি বছরের ৩ জন র‌্যাব সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে সন্ত্রাসীরা।


গত (১৩ জুন) ফতুল্লার মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় আবারও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় মাদক কারবারিদের হামলায় এক এসআইসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ সময় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মনির ওরফে ফাইটার মনিরসহ তিনজনকে ১৫ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশের উপর হামলা চালায় এই মাদক সন্ত্রাসীরা।  আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন— এসআই নন্দন সরকার, এসআই মনির, এএসআই কামরুল হাসান, এএসআই মনির হোসাইন এবং কনস্টেবল আশিক।  পুলিশ জানান, হামলাকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ১০ থেকে ১২ রাউন্ড গুলি ছোড়ে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও দুই রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে হামলাকারীদের ছোড়া গুলিতে ফাইটার মনিরের পায়ে গুলি লাগে। হামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।


একই সাথে বিএনপির রাজনৈতিক ব্যানার অসাধু শতকথা সামাজিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় ঝুট নিয়ে উত্তেজনা ও মাদক ব্যবসা বাড়ছে। ইতিমধ্যে ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে সোহেল ও খালিদ হাসান রবিন দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। ফতুল্লার কাঠের পুল এলাকার আরেক ত্রাশ খালেদ হাসান রবিন ও সোহেল। তারা বিগত সময় ফতুল্লার যুবলীগ নেতা আজমত ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজামের অনুসারী ছিলেন।


তৎকালীন সময়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করে কাঠের পুল এলাকায় গড়ে তুলেছিলো মাদকের বিশাল সম্রাজ্য। হাসিনা সকার পতনের পরে কিছুদিন গাঁ ঢাকা দিলেও বর্তমানে জেলা বিএনপি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির কিছু নেতার ছত্রছায়ায় আবার সেই আগের মাদক সম্রাজ্য গড়ে তুলেছে রবিন ও সোহেল। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশাল কিশোর গ্যাং যা দ্বারা ফতুল্লা কাঠেরপুল এলাকায় মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করে তারা। এদিকে নতুন রূপে ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় মাদক ও ঝুট ব্যবসার তীব্রতা কঠিন রূপ ধারণ করেছে।


রাজনৈতিক ব্যানার ও কিছু অসাধু সামাজিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় ঝুট নিয়ে উত্তেজনা ও মাদক ব্যবসা বাড়ছে। এদিকে গত বুধবার রাতে কুতুব আইল কাঠেরপুল, কোতালের বাগ, রামারাবাগ, সস্তাপুর, শিবু মার্কেট এলাকায় ঝুট ও মাদক ব্যবসার ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে সোহেল ও খালিদ হাসান রবিন দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। বর্তমানে ও পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ফতুল্লা একাধিক অপকর্মকারীরা মাদকের স্বর্গরাজ্যে তৈরি করেছে এই মাদক ব্যবসায়ীরা।


এ সকল এলাকায় স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এই স্পটগুলো। আশপাশের তরুণদের একটি অংশ এই মাদকচক্রের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে বলেও তারা জানান। তা ছাড়া বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় বিএনপির নাম বিক্রি করে ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে এই বাহিনীর সদস্যরা। তা ছাড়া আরো অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমঝোতা রয়েছে।


নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, ‘আমাদের পুলিশ সুপার মহোদয় নারায়ণগঞ্জ মাদকসহ সকল প্রকারের অপকর্মের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। তারই লক্ষে আমরা প্রতিনিয়ত মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা প্রতিনিয়ত মাদক কারবারী ও সেবনকারীদের গ্রেফতার করছি। তা ছাড়া অপকর্মকারীরা যাদের শেল্টারে থাকুক না কেন পার পাবে না।’

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন