Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

ধ্বংসের মুখে কৃষিখাত!

Icon

ফরিদ আহমেদ রবি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

ধ্বংসের মুখে কৃষিখাত!

ধ্বংসের মুখে কৃষিখাত!

Swapno



অতীতে নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি ছিল মূলতঃ কৃষি নির্ভর।কৃষি পণ্যজাত কুটির শিল্পের অবদানও নিছক কম ছিল না।শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা,বালু প্রভৃতি নদী বিধৌত নারায়ণগঞ্জের  কৃষি জমি ছিল অত্যন্ত উর্বর।ধান সহ বিভিন্ন মৌসুমী ফসল উৎপাদনে নারায়ণগঞ্জ ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় অঞ্চল সমূহের অন্যতম।ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পাট শিল্পের উত্থানে উন্নত মানের পাট চাষও অন্যান্য ফসলের সাথে জায়গা করে নেয়।পাট হয়ে ওঠে প্রধান অর্থকরী ফসল।সারা বিশ্বে পাট এবং পাটজাত পণ্য রফতানির লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জে গড়ে ওঠে বিভিন্ন শিল্প কারখানা।


বৃটিশ শাসনামল থেকে ৭০ দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত পাটের রমরমা ব্যবসা বজায় থাকে।পাট শিল্পের ঊত্থান এবং বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ বৃটিশ শাসনামলেই বিভিন্ন ফসল,বস্ত্র,সুতা এবং পাট শিল্পের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা কমে যাওয়ায় পাট উৎপাদন এবং পাট নির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহ অবলুপ্ত হতে হতে এখন প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে।পাটশিল্পের জায়গা দখল করে নিয়েছে তৈরী পোশাক খাত সহ অন্যান্য শিল্প কারখানা।


শিল্প খাতের বিস্তৃতির ফলে ধীরে ধীরে কমতে থাকে কৃষি জমির পরিমাণ এবং উর্বরতা।শিল্প বর্জ্যের দূষণে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি  চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। একসময়ের সমৃদ্ধ কৃষিখাত তার ঐতিহ্য হারিয়ে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।সুজলা সুফলা অঞ্চলটি  অতীত স্মৃতি বহন করে চলেছে।কৃষিখাতে নারায়ণগঞ্জ কতটা সমৃদ্ধ ছিল তার উদাহরণ; ডি এন ডি বাঁধ,অগ্রনী সেচ প্রকল্প সহ মৃতপ্রায় অসংখ্য ছোট-বড় বেড়িবাঁধ ও সেচ প্রকল্প। ডিএনডি বাঁধ হলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা এলাকার সুরক্ষা ও সেচ প্রকল্পের জন্য নির্মিত একটি বাঁধ।


১৯৬৮ সালে এই সেচ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। মূলত খরা মৌসুমে সেচ এবং বর্ষার সময়ে কৃষিজমি ও জনপদ রক্ষা এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।এই বাঁধের আওতাধীন এলাকায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং ডেমরার বিশাল অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কৃষি কাজের জন্য নির্মিত বাঁধের ভিতর এখন আর কৃষি জমি নেই, সব চলে গেছে আবাসন ও শিল্প খাতে।রূপগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেচ প্রকল্প হলো; অগ্রণী সেচ প্রকল্প।


এই প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয় তারাবো পৌরসভা ও আশপাশের রূপগঞ্জ এলাকার কৃষিকাজ এবং পানি ব্যবস্থাপনার জন্য।বেদখল ও বিভিন্ন খালের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এই সেচ প্রকল্প  প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ায় এলাকায় প্রায়ই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো এ অঞ্চলেও কৃষি জমি অনেক কমে গিয়েছে, উর্বরতা হারিয়ে অনেক ফসলি জমি অনাবাদী হয়ে পড়েছে।কারণ সেই একই,শিল্প ও আবাসনের বিস্তৃতি, সেই সাথে বর্জ্য দূষণ।এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই এলাকাটির অবস্থা ডি এন ডি‘র মতই হবে।


অপরিকল্পিত শিল্পায়ন,নগরায়ন এবং আবাসন কৃষি জমি ধ্বংসের মূল কারণ হলেও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। অনেকেই ভাবতে পারেন শিল্পায়নের ফলে কৃষি জমি নষ্ট হলেও বিকল্প আয়ের রাস্তা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সুতরাং শিল্পায়নের জন্য কৃষিজমি নষ্ট হলেই বা ক্ষতি কি? বিষয়টি অবশ্যই মেনে নেয়া যায় যদি শিল্পায়ন হয় পরিবেশ বান্ধব, পরিকল্পিত, যাতে অন্যান্য জমি শিল্প বর্জ্যের জন্য অনাবাদী হয়ে না পড়ে।


তাছাড়া সব জমিই কিন্তু আবাদযোগ্য নয় সুতরাং শিল্পায়নের জন্য এই ধরনের জমি বেছে নেয়া হলে শিল্পায়ন এবং কৃষি উৎপাদন সমান তালে চলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।পাটশিল্প ছিল পরিবেশবান্ধব তাই কৃষিজমি নষ্ট হওয়ার কোন অবকাশ ছিল না। বর্তমানে যে সমস্ত শিল্প কারখানা কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে তার সিংহভাগ শিল্পবর্জ্য উদগীরণ করে থাকে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শুধু কৃষি জমি নয় দূষণ থেকে রক্ষা পাবে নদ-নদী সহ বিভিন্ন জলাশয়।


নাগরিক জীবন হবে পরিবেশ দূষণ মুক্ত।শিল্পায়ন যতই সমৃদ্ধ হোক তা কখনই কৃষির বিকল্প হতে পারে না।উর্বরা জমি প্রকৃতির আশির্বাদ তাই এমন জমিতে শিল্পায়ন কোনভাবেই কাম্য নয়।কাগজ কলমে জমির শ্রেণীকরণ থাকলেও সে অনুযায়ী জমির ব্যবহার হয়না বললেই চলে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক পাশাপাশি আবাদযোগ্য কৃষি জমির ব্যবহার শুধুমাত্র কৃষিকাজের জন্য নিশ্চিত করা হোক, এমন প্রত্যাশা সচেতন এলাকাবাসীর।


অপরিকল্পিত শিল্পায়ন শুধু কৃষি জমিই ধ্বংস করেনি,নারায়ণগঞ্জ পরিণত হয়েছে পরিবেশ দূষণের  সর্বোচ্চ শিকারে।যার খেসারত  দিতে হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি  মানুষকে। বিভিন্ন কারণে  ফসলি জমি যা নষ্ট হওয়ার হয়েছে,আর যেন কোন জমি নষ্ট না হয়, শিল্প বর্জ্যে উর্বরতা না হারায়,আবাদী জমিতে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান যেন নির্মিত না হয়,দেশের স্বার্থে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তা প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং শিল্পের সমান্তরাল যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে আসবেন এমনটিই প্রত্যাশা। লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন