না.গঞ্জকে লুটে খাওয়া তিন এমপি বিদেশে ফুরফুরে
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
না.গঞ্জকে লুটে খাওয়া তিন এমপি বিদেশে ফুরফুরে
শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাতি পাওয়া নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ রয়েছে। কিন্তু বিগত দিনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যরা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সেক্টর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সব লুটে পুটে খেয়ে খোকলা করে দিয়েছেন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক একেএম শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক গোলাম দস্তগীর গাজী এবং নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাবেক নজরুল ইসলাম বাবু, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সাংসদ সদস্য সেলিম ওসমান স্থানীয় প্রশাসন ও নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে জেলার প্রায় সকল সেক্টর নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তীতে ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের শতাধিক মামলায় দখলদারিত্ব লুটে খাওয়া সেই লুটেরারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে আয়েশী জীবন পালন করছেন। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সাংসদ সদস্য দেশে থাকলে ও রক্ষাকবচে আটকা থাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন।
আর এর বাহিনী নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সাংসদ সদস্য কায়সার হাসনাত বিদেশে রয়েছেন একই সাথে সাবেক সাংসদ শামীম ওসমান ও নজরুল ইসলাম বাবু আমেরিকায় আয়েশী জীবন পার করছেন। এক কথায় বলা চলে না.গঞ্জকে লুটে খেয়ে সাবেক ৩ এমপি দেশের বাহিরে ফুরফুরে মেজাসে রয়েছেন। সেই সাথে এমপি থাকাকালে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন যা বসে বসে ব্যয় করলেও এক দশকে চিন্তা করতে হবে না।
দেশে থাকা ব্যবসা স্থানীয় বিএনপির কোন কোন নেতার পরোক্ষ সহযোগীতাতেই চলছে। ফলে আয়েশী জীবনেই আছেন তারা। অন্যদিকে ৫ আগস্টের পর থেকেই জেলে আছেন সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তার হয়ে টানা এক বছর জেল খেটে জামিনে বেরিয়েছেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। কিন্তু লুটে পুটে খাওয়া বাকিরা দেশের বাহিরে কর্মীসহ নারায়ণগঞ্জবাসীকে তোয়াক্কা না করেই ফুরফুরে মেজাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সম্প্রতি অনলাইনে শামীম ওসমানকে বলতে শোনা যায়, ৫ আগস্টের পরেই দেশ ছাড়েন তিনি। খুব বেশী অসুবিধা হয়নি তার দেশ থেকে পালাতে। এই বিষয়ে বেশ অভ্যস্ত বলেও জানান। যদিও বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জের এক বিএনপি নেতার সহযোগীতা নিয়েই দেশ ছেড়ে পালায় শামীম ওসমান ও তার পরিবার। তবে সেই বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি পলাতক এই সাবেক এমপি।
বাকিরা অসুস্থ ও মামলাজনিত কারনে সহায়তা চেয়েও পাননা। এভাবেই চলছে আওয়ামী লীগের তৃণমুলের রাজনীতি। একদিকে লুটেরা গোষ্ঠি আছে আরাম আয়েশে। আর কেবল রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ কর্মীদের। যাদের অনেকেই এই আন্দোলন নির্মমভাবে দমনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো। তবে শামীম ওসমান এবং নজরুল ইসলাম বাবুর আয়েশী জীবন দেখে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
তেমনি আইভীর অনুসারীরা হয়েছেন চাঙ্গা। তারা বলছেন, পালিয়ে থাকার বদলে বিচারের মুখোমুখী হয়েছেন সাবেক এই মেয়র। সেই সাথে আইভীর দৃঢ় অবস্থান এবং সংস্কারবাদী ভাবনা দেখে নিজেরাও ভাবছেন নতুন ভাবে রাজনীতির চিন্তা করতে। কর্মী ফেলে পালানো এবং দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বাদ দিয়ে ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন নেতাদের পেছনে রাজনীতি করতে চাচ্ছেন অনেকেই। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সাংসদ সদস্য কায়সার হাসনাত বর্তমানে বিদেশে আয়েশী জীবনে আছেন। বিভিন্ন সময় ভিডিওতে এসে হুঙ্কার দিতে দেখা যায় এই কায়সারকে। এদিকে বর্তমানে দেশের বাহিরে বসেই নভেম্বর-ডিসেম্বর হুঙ্কার দিচ্ছেন। যা এক কথায় বলা চলে ভিত্তিহীন।
ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও এলাকাছাড়া করে জমিগুলো লিখে নেওয়া হতো। বিসিক শিল্পনগরী ও ঝুট নিয়ন্ত্রণ: নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যার ও বিসিক (ইঝঈওঈ) শিল্পনগরীর শত শত তৈরি পোশাক কারখানার 'ঝুট' (গার্মেন্টস বর্জ্য) ব্যবসা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত এমপিদের পরিবার ও তাদের ক্যাডাররা। শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের নিয়ন্ত্রণে জেলার বেশিরভাগ বড় গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা জোরপূর্বক কম দামে নিজেদের কব্জায় রাখা হতো এবং ভিন্ন কেউ এই ব্যবসায় ঢুকতে পারত না। নদীপথের ঘাট, খেয়াঘাট এবং ড্রেজিং বা বালু তোলার ব্যবসা এমপি ও তাদের অনুসারী কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বালুমহাল ইজারা না নিয়েই জোরপূর্বক দখল করে ব্যবসা চালানো হতো। মাদক সিন্ডিকেট ও টেন্ডারবাজি গণপূর্ত, এলজিইডি, ওয়াপদা এবং সিটি কর্পোরেশনের বড় বড় উন্নয়নকাজের টেন্ডার বা ঠিকাদারি কাজ সাধারণ ব্যবসায়ীরা পেতেন না। শামীম ওসমানের কার্যালয় হিসেবে পরিচিত রাইফেল ক্লাব থেকে এসব টেন্ডার বণ্টন বা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তা ছাড়া শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ক্যাডারদের (যেমন শাহ নিজাম) মাধ্যমে পুরো জেলার মাদক সিন্ডিকেট ও জুয়ার বোর্ড পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা হতো বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তদন্ত ও মামলায় উঠে এসেছে। এর বাহিরে ও আরো শত শত অপকর্মে জড়িত ছিলো এই কুখ্যাত সন্ত্রাস শামীম ওসমান।
দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড়: জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছিল। ঢাকার বাইরে গাজীপুরের হোতাপাড়ায় বিপুল পরিমাণ জমিছাড়াও মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাণিজ্যিক প্লট এবং লন্ডনে ফ্ল্যাট কেনার মতো অর্থ পাচারের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছেসহ আরো একাধিক অভিযোগ।


