নারায়ণগঞ্জ মূলত তার ঐতিহাসিক ও আধুনিক ব্যবসার জন্য ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ এবং বাংলাদেশের ব্যবসায়িক হাব হিসেবে পরিচিত। এই শহরে বস্ত্র, সুতা, পাট, এবং হোসিয়ারি শিল্পের মতো বড় বড় ব্যবসা রয়েছে। এই বাণিজ্যেক ব্যবসার পশাপাশি বর্তমানে হড়েক রকমের মাদক ব্যবসায় পরিচিত লাভ করেছে জেলাটি। মাদকের নিরাপদ রুট ও বাজার হিসেবে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, সংঘবদ্ধ কারবারিদের দৌরাত্ম্য, কিশোর-তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার এবং মাদককে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা অপরাধ সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক নজরদারির কিছুটা শিথিলতার সুযোগ নিয়ে মাদক চক্রগুলো আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকাগুলো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের অবাধ বেচাকেনা। এদিকে নির্বাচনের পূর্বে নারায়ণগঞ্জের এক জনসামাবেশে ২০টি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত আখ্যা দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী নারায়ণগঞ্জের চিহ্নিত ২০টি মাদকের স্পট নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের মাদকের বিষফোঁড়া হিসেবে ২০ টি চিহ্নিত স্পট রয়েছে সেগুলো হলো- ফতুল্লার চানমারী, মাসদাইর, শহরের জিমখানা র্যালিবাগান, জল্লারপাড়া, রূপগঞ্জের চনপাড়া, ভূলতা, সিদ্ধিরগঞ্জের বিহারী ক্যাম্প,বন্দরে দড়িসোনাকান্দা (লেঙ্গগা শরীফ ও রেললাইন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন), মাহমুদপুর এবং মদনপুর একাধিক স্পট রয়েছে। তা ছাড়া আড়াইহাজার ও সোনারগাঁওয়ে একাধিক স্পট রয়েছে। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে মাদকের বড় স্পট ২০টির মতোই হবে।
তিনি আরো জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জে বড় ২০টি মাদকের স্পট থাকলে ও খুচরা বিক্রির স্পট শত শত রয়েছে। বর্তমানে আমরা চিহ্নিত মূল স্পটগুলোতে নিয়মিত নানাভাবে অভিযান অবহৃত রেখেছি। এদের মধ্যে চিহ্নিত অনেককেই মার্ক করেছি এবং তাদের বিরুদ্ধে আইগত ব্যবস্থা চলছে। তা ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স চলমান রয়েছে। প্রতি নিয়ত তথ্য অনুসারে ধাপে ধাপে আমাদের অবিযান কার্যক্রম চলছে।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এই মাদক ব্যবসায়ীরা যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন। এই মাদক ব্যবসায়ীদের কোনোভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর এই মাদককে কেন্দ্র করেই সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত এই মাদক ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। কয়েকদিন পরপরই মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান করতে গেলেই তাদের উপড় হামলা করা হচ্ছে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণামূলক সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ও কর্মসংস্থান খাতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ২৬ জানুয়ারি রাতে সোনারগাঁর কাঁচপুর বালুর মাঠে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রতিশ্রুতি দেন।
সেদিন তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘গত কয়েক বছরে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি অপরাধের বিচার দেশের প্রচলিত আইনে নিশ্চিত করা হবে। দখলবাজি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। ‘দুর্নীতি ও মাদক’ সমাজের প্রধান শত্রু মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর আশপাশে মাদকের ২০টি স্পট রয়েছে। এখানে মাদক ব্যবসার যে বিস্তার ঘটেছে, তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তার এই বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জে বেশ সাড়া ফেলেছিলো।
সে সময় থেকেই এসকল মাদক স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবী উঠে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই নিবাচনের পরপরই এসকর স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবি দিন দিন জোড়ালো হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আর এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদক নিয়ে পরিস্থিতির কতটা উন্নয়ন হয়েছে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু সেই ২০ স্পটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ আসছে না।
কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত ৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে ধরতে গিয়ে র্যাব-১১ এর সদস্যরা সশস্ত্র হামলার মুখে পড়েন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে একই দিনে পৃথক দুটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, দেশীয় ধারালো অস্ত্র, নগদ অর্থ, সিসি ক্যামেরা, একটি ড্রোন, ২৩৫ কেজি গাঁজা এবং ১১ হাজার পিস ইয়াবাসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ে জেলার অন্যতম বড় মাদকবিরোধী অভিযান।
মাদকের স্পটের এলাকাগুলোর স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক কেনাবেচা। প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকি কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটে। ফলে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না। মাদকের ভয়াবহ প্রভাব এখন শুধু আসক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, শহরে সংঘটিত চুরি, ছিনতাই, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া, বাসাবাড়িতে চুরি, এমনকি কিছু সহিংস অপরাধের সঙ্গেও মাদকাসক্তদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতেই অনেক তরুণ অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি পরিবারগুলোও চরম সংকটে পড়ছে। শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কিশোর ও তরুণ সমাজ।
স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী কৌতূহল কিংবা বন্ধুদের প্রভাবে প্রথমে মাদক গ্রহণ শুরু করে, পরে তা আসক্তিতে রূপ নেয়। একসময় লেখাপড়া ছেড়ে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া গতকাল দেওভোগের নাগবাড়ি, হাসেমবাগ, বাঁশমুলিতে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু দিন যতই বাড়ছে এর পাশাপাশি খুচরা মাদক বিক্রেতারা বড় মাদকের স্পট হিসেবে সেই এলাকায় ধারণ হচ্ছে এমনভাবেই জেলা জুড়ে বাড়ছে মাদকের বিস্তার।