Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

নারায়ণগঞ্জের রেলপথ মাফিয়াতন্ত্রের জালে বন্দী এক ঐতিহ্য

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

নারায়ণগঞ্জের রেলপথ মাফিয়াতন্ত্রের জালে বন্দী এক ঐতিহ্য

নারায়ণগঞ্জের রেলপথ মাফিয়াতন্ত্রের জালে বন্দী এক ঐতিহ্য

Swapno



বাংলাদেশের প্রথম দিকের রেলপথগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ রেললাইন। প্রায় ১৪০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই রেলপথ একসময় ছিল রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জের জীবনরেখা। কিন্তু আজ এই ঐতিহ্যবাহী পথ পরিণত হয়েছে অবহেলা, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্রের শিকার এক নিস্তব্ধ স্মৃতিচিহ্নে।


১৯৭১ সালের পর থেকে গত ৫৪ বছরে ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে এই রেল যোগাযোগ। প্রথমে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিআরটিসি রুট, এরপর কমানো হয় ট্রেনের সংখ্যা ও সময়সূচি। এমনকি রেলপথকে “অকার্যকর” বানানোর নেপথ্যে কাজ করেছে এক অদৃশ্য প্রভাবশালী চক্র—যাদের হাতে বন্দি এই শহরের স্বপ্ন ও গতি।


গত চার দশক ধরে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ঘোষণা এসেছে “ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল ট্র্যাক লাইন” চালুর। কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি বলতে যা হয়েছে, তা দাঁড়িয়েছে চাষাড়া পর্যন্ত এসে থেমে থাকা এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে। মাত্র হাফ কিলোমিটার পথ চাষাড়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বন্ধ আছে কেবল ১৬ ফিট জায়গা অধিগ্রহণের অভাবে। এ যেন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতীকী প্রতিচ্ছবি— বিশাল প্রকল্প, বিশাল ব্যয়, কিন্তু শেষ বাধা “এক টুকরো জমি”!


নারায়ণগঞ্জের সরকারি কৌশলি (জিপি) এডভোকেট খন্দকার আবুল কালাম আজাদ যথার্থই বলেছেন, “১৬ ফিট জায়গা অধিগ্রহণ সরকারের জন্য মামুলি ব্যাপার।” অথচ এই ‘মামুলি’ ব্যর্থতার কারণে আজও নারায়ণগঞ্জ শহর প্রতিদিন ডুবে থাকে যানজট, সময় ও অর্থক্ষয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ৩০ মিনিট পর পর ট্রেন সার্ভিস চালু হয়, তাহলে শহরের যানজট ৭০ ভাগ পর্যন্ত কমে আসবে। অথচ বাস্তব চিত্র উল্টো— রেলের কাজ থমকে, ট্রেন সার্ভিস অপ্রতুল, আর মাফিয়াতন্ত্র দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।


সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, একটি মহল ইচ্ছে করেই ডাবল ট্র্যাক প্রকল্পের অগ্রগতি বন্ধ করে দিয়ে “মেট্রোরেল” এর হুজুক তুলছে যেন মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়া যায়। এতে যুক্ত হয়েছে কিছু রাজনৈতিক মাফিয়া, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, এমনকি একাংশের তথাকথিত সুশীল সমাজ। উদ্দেশ্য একটাই— রেল যোগাযোগের মৃত্যু ঘটিয়ে সড়ক পরিবহন মাফিয়াদের স্বার্থ রক্ষা করা।


কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন আমরা বারবার মাফিয়াদের কাছে আত্মসমর্পণ করব? কেন একটি শহরের শতাধিক বছরের রেল অবকাঠামো অবহেলায় ধ্বংস হবে, যখন সেটিই পারে শহরকে নতুনভাবে বাঁচাতে?


নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ এখন এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছে। তারা চায়, ঐতিহ্যের রেলপথ আবার জীবিত হোক; রাজধানীর সাথে এই শহরের শ্বাস-প্রশ্বাসের যোগ আবার ফিরে আসুক। সময় এসেছে রেলকে পুনরুজ্জীবিত করার। সময় এসেছে মাফিয়াতন্ত্র ভেঙে নাগরিক অধিকারের পথে হাঁটার।


নারায়ণগঞ্জের এই রেলপথ শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, এটি এই শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মার অংশ। সরকারের উচিত দ্রুত ডাবল ট্র্যাক প্রকল্প সম্পন্ন করে এই রেলপথকে কার্যকর করা। উন্নয়নের নাম করে যদি পুরনো ঐতিহ্য ধ্বংস করা হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। রেলপথ বাঁচানো মানে নারায়ণগঞ্জের জীবন বাঁচানো।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন