চাঁদাবাজদের ধরতে শুরু হচ্ছে সাঁড়াশি অভিযান
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
চাঁদাবাজদের ধরতে শুরু হচ্ছে সাঁড়াশি অভিযান
প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলায় মাদক, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ভূমিদস্যুতা, পরিবহন খাত, হাট-বাজার, মাঠ-ঘাটগুলোকে দখল করে ঘিরে রেখেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু চাঁদাবাজরা। শিল্পাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত থাকায় এই জেলায় চাঁদাবাজিসহ নানান অপকর্মের মাত্রা একটু বেশি বললেই চলে। বিগত দিনে এই সকল অপকর্মের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতারা জড়িত থাকলে ও পটপরিবর্তনের পর বর্তমান ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরাই যুক্ত রয়েছে। এদিকে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কিছুটা নিরবতা দেখা দিলে ও কয়েক মাস যাবৎ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়েছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ক্ষমতার পালাবদল হলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি এমন অভিযোগও উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাঁদাবাজি বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়ে ইতোমধ্যে তালিকা প্রণয়ন ও অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া বর্তমানে শুরু হয়েছে আইনশৃঙ্খল বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। যাকে ঘিরেই এরই মধ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে আটক করাকে নতুন বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত রবিবার (২১ জুন) দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়। এর পর পরই নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়কের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় যুবদল। একই দিনে রাত দেড়টায় মুচলেকা নিয়ে তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অনেকের মতে, যেখানে একজন সংসদ সদস্যের ছেলে ছাড় পাচ্ছেন না, সেখানে অন্যদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এদিকে গতকাল রাত থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নাশকতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে নারায়ণগঞ্জে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার (২২ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় নারায়ণগঞ্জসহ দেশের ছয়টি জেলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন থাকবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এতে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও চট্টগ্রামেও সেনা মোতায়েন থাকবে। যাকে কেন্দ্র করে অপকর্মকারী একটি গোষ্ঠি আতঙ্কে রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মৌমিতা পরিবহনের শ্রমিকরা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, সদস্য মাহবুবউল্লাহ তপন এবং ১৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিরা সরদারের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ করেন মৌমিতা পরিবহনের নারায়ণগঞ্জ রুটের পরিচালক রফিজ উদ্দিন কালা। এখনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্র কিন্তু দ্রুত নিবে বলে আশাবাদী স্থানীয়রা। এ ছাড়া ও এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ফুটপাত দখল, মাদক ব্যবসায়ীদের শেল্টারসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের (৩০ জুলাই) নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার একটি দোকানঘরে দলীয় কার্যালয় গড়ে তোলা বিএনপি নেতাদের কাছে ভাড়া চাওয়ায় মালিক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে মারধর করে হত্যার অভিযোগে স্থানীয় ৫ নেতাকে বহিষ্কার করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। বহিষ্কৃতরা হলো- আড়াইহাজার উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোতা মেম্বার, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক খোকন প্রধান, বিএনপির সদস্য রাসেল প্রধান, আলম মিয়া ও সাদ্দাম হোসেন। দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়। তা ছাড়া ও গত ৫ আগষ্টের পর নারায়ণগঞ্জে প্রায় অর্ধশত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নানা অপকর্মে বহিস্কার করেন কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড।
অনুসন্ধান বলছে, নারায়ণগঞ্জ শহরেই ১২টি স্পটে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা। শহরের সবচেয়ে বেশি চাঁদা তোলা হয় চাষাঢ়া গোল চত্বর থেকে। এই মোড়েই রয়েছে ৬ টি অবৈধ স্ট্যান্ড। অপরদিকে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগি নেতাকর্মীদের অপকর্মে আরও বড় হচ্ছে। পুলিশের তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে সড়ক, হাটবাজার, বালুমহাল, বাস-টেম্পো স্ট্যান্ড, নৌ ঘাট, মাছ বাজার, ভ্রাম্যমাণ কাঁচাবাজার, সরকারি লিজকৃত জমিতে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাইকারি আড়ৎ এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে চাদাঁবাজ চক্র।
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, তালা ঝুলিয়ে দেওয়া কিংবা নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটায় তারা। চাদাঁবাজরা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের পরিচয়ও বদলে ফেলে। একপর্যায়ে তারা নতুন ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং চাঁদা আদায় করতে শুরু করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে দলীয়ভাবে কঠোর অবস্থান না নিলে বিএনপির ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাছাড়া এই ভাবে দিনের পর দিন অপকর্ম চলতে থাকলে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি খেসারত দিতে হতে পারে। যা পরে বুঝতে পারলেও কিছু করার থাকবে না। এদিকে বর্তমানে সাঁড়াশি অভিযান শুরু প্রায়। সর্বশেষ এমপি পুত্র আটকের ঘটনায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


