নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম যানজট প্রবণ এলাকা ২নং রেলগেট। নগরবাসীকে যানজট মুক্ত রাখতে রীতিমত যুদ্ধ করছে নাগরিক সমাজ। স্বল্প জায়গা, রাজউক, রেলওয়ের জায়গা বিক্রি, দখলের কারণে নারায়ণগঞ্জ শহরে নতুন সড়ক নির্মাণ কিংবা পরিকল্পনা সিটি কর্পোরেশন তো বটে, জাতীয় পরিকল্পনাতেও আনাও দূরুহ কাজ। তবে গত ১৭ বছর মামলা মোকদ্দমা আর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের প্রভাবে ব্যস্ততম ২নং রেলগেট এলাকায় ২২১শতাংশ জমির সিদ্ধান্ত সুপ্রীম কোর্টেও আপীল বিভাগে ঝুলছে।
শহরের ব্যস্ততম এই জায়গার পাশ দিয়ে নতুন সড়ক নির্মাণে কাজ ধরতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। বিশাল এই জায়গা সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আসলে শহরের যানজট লাঘবে বিরাট ভূমিকার রাখবে বলে মত নগর বিশেষজ্ঞদের।
সরেজমিন দেখা যায়, এই জায়গার বিশাল এলাকাজুড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। এই জায়গায় স্থাপনার মধ্যে মনির হোটেল (মালিক মনির হোসেন), ফুডল্যান্ড বেকারী, ফুড গার্ডেন রেস্টুরেন্ট, শরীফ রেস্টুরেন্ট, আল্লাহর দান বিরিয়ানি হাউজ, জামান এন্টারপ্রাইজ, জালাল এন্টারপ্রাইজ, আমান কালার থ্রেড, ফরিদ ষ্টোর, বাবুল ষ্টোর, ছোয়া কালার থ্রেড, এম.আর এন্টারপ্রাইজ, সবুজ এন্টারপ্রাইজ, ভাই ভাই ষ্টোরসহ পেছনে সমগ্র রেলওয়ে মার্কেটের কয়েকশ দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া উঠছে। এই ভাড়া কারা নিচ্ছে স্পষ্ট করেও কেউ বলছেন না।
তবে মার্কেটের এককোনে সাইনবোর্ড সাটানো, যাতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আপীল বিভাগ। বর্তমানে অত্র সম্পত্তি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে আপীল মামলা চলিতেছে,যাহার দেওয়ানী আপীল নং-১৮৪১/২০। আপীল কারী বাংলাদেশ রেলওয়ে বনাম প্রতিপক্ষ মোখলেচুর রহমান গং। যাহার তপছিল : সে.মে.১৮৮৮ নারায়ণগঞ্জ ‘খ’খন্ড মৌজাস্থিত ২নং রেলগেট সংলগ্ন বাংলাদেশ রেলওয়ে ভূমি যাহার উত্তরে রেললাইন উকিলপাড়াস্থ ভূমি, দক্ষিণে আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক,পূর্বে বঙ্গবন্ধু সড়ক ও ২নং রেলগেইট, পশ্চিমে নতুন পালপাড়া।
এই চৌহদ্দির মধ্যে বাংলাদেশ রেলয়ের পক্ষে রেলওয়ে সুপার মার্কেট, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দোকান মালিক সমিতি, গভ: রেজি নং ঢাকা-৩৫৬০ এর দাবিকৃত ২২১ শতাংশ বটে। অত্র তপছিলী সম্পত্তি নিয়া নারায়ণগঞ্জ মোকামে ৪র্থ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী মোকাদ্দমা নং-৫৭/২১ মামলা চলিতেছে, যাহার আদেশ স্থিতিবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ আছে। অত্র তপছিলী সম্পত্তি নিয়া নারায়ণগঞ্জ মোকামে দেওয়ানী মোকাদ্দমা নং-৪৮৬/২১ চলিতেছে। মোখলেছুর রহমান ওয়ারীশগণ এর বিরুদ্ধে স্থিতিবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ আছে।’
জানা গেছে, ২০২১ সালে এই জমিতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জমির মালিককে বুঝিয়ে দিতে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিআইডি ব্রাঞ্চের বিশেষ পুলিশ সুপার ববাবর আবেদন করেন কানাডা প্রবাসী ফেরদৌস বারী (জন)। তিনি প্রেসিডেন্ট অব কানাডিয়ান-বাংলাদেশী পাবলিক এফেয়ার্স কমিটি, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলদেশ আওয়ামী লীগ কানাডা শাখা এবং লিবারেল পার্টি অব কানাডা, অশোয়া অঞ্চলের রাইডিং চেয়ারম্যান।
দখলদারদের উচ্ছেদে ২০২১ সালের লিখিত আবেদনে কানাডা প্রবাসী ফেরদৌস বারী (জন) উল্লেখ করেন, ২নং রেলগেট এলাকার ওই সম্পত্তির খরিদ সূত্রে মালিক তার শ্বশুর মরহুম মোখলসুর রহমান ওরফে পেয়ার আলী মুন্সী। তিনি ২০২০ সালের করোনা মহামারী চলাকালীন ২৮ শে এপ্রিল তিন কন্যা রেখে মৃত্যুবরণ করে। তাঁর অবর্তমানে জনের স্ত্রী ও তার পরিবার অজিওন বারী গং উল্লেখিত সম্পত্তির ওয়ারিশ সুত্রে মালিক। পেয়ার আলী মুন্সীর তিন কন্যা প্রবাসে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। জ্যেষ্ঠ কন্যা অজিওন বারী কানাডা প্রবাসী, দ্বিতীয় কন্যা ফায়জুন আমিন এবং কনিষ্ঠ কন্যা নাজমুন বারী বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী। প্রায় দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে এই চলমান মামলা তাদের।
২০২০ সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। রেলওয়ের সাথে দীর্ঘদিন মামলা চলমান থাকাকালীন সময়ে কতিপয় দখলদার ও ভূমিদস্যু উক্ত জায়গায় বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা, মার্কেট ইত্যাদি গড়ে তোলেন যাতে সর্বমোট দোকানের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ শতাধিক এবং বছরের পর বছর ধরে এসব স্থাপনা থেকে অবৈধ সুবিধা লাভ করে আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০২০ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে দেশে এসে এই সম্পত্তি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও তার উদ্ধারে পুলিশের সাহায্য কামনা করেছেন জমির দাবিকৃত মালিকরা। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে নগরবিশেষজ্ঞদের মত, রেলওয়ে কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি যারই হোক, নারায়ণগঞ্জ শহরে পরিকল্পিত উন্নয়নের স্বার্থে, নারায়ণগঞ্জবাসী, এই শহর দিয়ে চলাচলকারী লাখ লাখ মানুষের কষ্ট লাঘবে সিটি কর্পোশেনকে যুক্ত করে বৃহত্তর পরিকল্পনা করলে নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট মুক্ত করতে বড় ধরণের সাফল্য পাওয়া যাবে।