Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

ফতুল্লার গিরিধারায় দগ্ধ হয়ে একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু

দায় রয়েছে বাড়িওয়ালার

Icon

মাহফুজ সিহান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

দায় রয়েছে বাড়িওয়ালার

দায় রয়েছে বাড়িওয়ালার

Swapno


রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে ঘুনাক্ষরে কেউ ভাবেনি নিজের বাসায় পরিবারের সকল সদস্যদের এটিই শেষ কথা, শেষ ঘুম। এক বিস্ফোরণে লাশ হয়ে অ্যাম্বুলেসে করে পটুয়াখালি জেলার বাউফলের বাড়িতে ফিরতে হবে সবজি বিক্রেতা কালামের পরিবারকে। তবে এই বিস্ফোরণের নেপথ্য কারণে দায় রয়েছে ভবন মালিক মো. শাহজাহান মিয়ারও। তার অবহেলা আর তুচ্ছতাচ্ছিলে নিমিষের এক বিস্ফোরণে মৃত্যুর মিছিলে সবজি বিক্রেতা কালামের গোটা পরিবার।


নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার উত্তর ভূঁইগড় এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে গিরিধারা এলাকার ৬ নাম্বার সড়কে মো. ভবন মালিক শাহজাহান মিয়ার আটতলা ভবনের নিচতলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে ১০ মে গ্যাসলাইনের লিকেজ বিস্ফোণের ঘটনা ঘটে। এতে কালাম-সায়মা দম্পতির তিন শিশু সন্তান মুন্না (৭), কথা (৪) ও মুন্নি (১০), ৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্তা মো. কালাম, সর্বশেষ ১৫ মে সকালে কালামের স্ত্রী সায়মা (৩২) মারা যান। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের চান্দে আলীর ছেলে। তাঁর স্ত্রী মৃত সায়মা একই উপজেলার কামাকদিয়া এলাকার আবদুস সালামের মেয়ে।

তবে এই মৃত্যু নিছক এক দুর্ঘটনা বললে ভুল হবে। কেননা, দুর্ঘটনার পর এলাকার মানুষ দুষছেন ভবন মালিক শাহজাহান মিয়ার অবহেলাকেও। স্থানীয়রা জানান, মালিক শাহজাহান ও তাঁর পরিবার এই ভবনে বসবাস করেন না। রাজধানী ঢাকার বংশালে চায়না মালের ব্যবসা করেন। সেখানেই বসবাস করেন। এই ভবনের প্রতিতলার দুই ইউনিটের রান্নাঘরে ভেন্টিলেটর নেই। ভবনটির নিচতলায় যেপাশে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেটিও একই অবস্থা। শুধু তাই নয়, রান্নাঘরের সামনে বাড়ির সীমানা দেয়ালের মধ্যবর্তী অংশটি ঠাসা ছিল নানা ময়লা, আবর্জনার  বস্তা দিয়ে। এছাড়া বাড়িওয়ালার নির্দেশ ছিল ভাড়াটিয়াদের প্রতি, যাতে তারা রুমের থাইগ্লাসগুলো কোনভাবেই না খোলেন।

সরেজমিন ১৫ মে দুর্ঘটনাস্থল ভবনে গিয়েও বিষয়টি সত্যতা মেলে। পাশের বাড়ির স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, নিচতলার ওই ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের জানালা থেকে সীমানা প্রাচীরের মধ্যবর্তী অংশ এমনভাবে আটকে দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন বস্তা দিয়ে যাতে জানালা খোলা না যায়। এই কারণে এই ফ্ল্যাটের মধ্যে যারা বসবাস করতো তার কেউ জানালা খুলতে পারতো না। একটিও জানালাও খোলা ছিলনা। ময়লা দিয়ে এমনভাবে জ্যাম করে রাখা হয়েছিলো যাতে এটি চেষ্টা করলেও খোলা না যায়, জানালাগুলো যাতে বন্ধ থাকে, হাওয়া-বাতাস বের হওয়ার জায়গা না থাকে।  

স্থানীয় আরেক ব্যক্তি জানান, ‘এই বাড়ির দুই ইউনিটের পাশের ইউনিটটি বর্তমানে যেভাবে জ্যাম করা আছে বাউন্ডারির মধ্যে, বিস্ফোরণ ঘটা ফ্ল্যাটটিতেও একই অবস্থা ছিল। গুদামের মতো করে রেখে থাইগুলো আটকে দেয়া ছিল। যার ফলে গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ পায়নি, তারা সবাই দ্বগ্ধ হন।’  

এদিকে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর ভয়ে বাসা ছেড়ে গেছেন পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও। সরেজমিন ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখা গেছে, নিচতলার ওই ফ্ল্যাটে স্বাভাবিক বাতাস চলাচলের কোন ব্যবস্থা নেই। রান্নাঘরের অংশে কোন ভেন্টিলটরের ব্যবস্থা নেই।

প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরে গ্যাস লাইনে লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে এই দুর্ঘটনা ঘটার কথা বলা হলেও, ধামাচাপা পড়ে যায় ভবন মালিকের এই অবহেলা, আর উদাসীনতার কথা। দুর্ঘটনার পর  নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরিফিন জানান, ‘ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া মো. শাহজাহান মিয়া। ফ্ল্যাটের পশ্চিম পাশের রুমের সঙ্গে থাকা রান্নাঘরে গ্যাস লাইনে লিকেজ ছিল। এতে বন্ধ কক্ষে গ্যাস জমে যায়। প্রাথমিক তদন্তে গ্যাস জমে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি গ্যাস লাইটারও উদ্ধার করা হয়েছে।’

এদিকে ভবনটির কেয়ারটেকার বাবুল সিপাহী জানান, দুর্ঘটনার দিন আমি সকালে শুয়ে ছিলাম। বিকট শব্দ শুনে আমি বাইরে এসে এই দুর্ঘটনা দেখতে পাই। তিনি দাবি করেন, সবজি বিক্রেতা কালামের একটি সন্তান মানসিকভাবে অসুস্থ্য ছিল, সে গ্যাসের চুলা বাড়িয়ে রাখায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর মালিক এই বাড়িতে এসেছেন এবং হাসপাতালে কালাম পরিবারকে দেখতে গিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। ভেন্টিলেটর কেন রাখা হয়নি এমন প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ভবনের মালিক শাহজাহান মিয়ার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তার স্ত্রী ফোন রিসিভ করেন। তিনি জানান, শাহজাহান মিয়া অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কথা বলতে পারবেননা। ভবন নির্মাণের সময় রান্নাঘরে ভেন্টিলেটরের কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি কেন জানতে চাইলে, তিনি জানান, এখন এসব বিষয়ে কথা বলতে পারবোনা। শাহজাহান মিয়াকেও এমন প্রশ্ন করা যাবেনা বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ, দুর্ঘটনায় আক্রান্ত সবজি বিক্রেতা কালামের ফ্ল্যাটটি বিধ্বস্ত অবস্থাতেই পড়ে রয়েছেন। এখানে কালামের কোন আত্মীয়-স্বজন থাকেননা। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাসপাতালে পুরো পরিবার মারা যাওয়ার পর সেখান থেকেই শুক্রবার সকালে পটুয়াখালীর বাউফলের কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামে নেওয়া হয়েছে লাশ। সেখানে চান্দে আলীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে সায়মাকেও। একই পরিবারের পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ।

দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ফ্ল্যাটের রান্নাঘর সংলগ্ন পশ্চিম পাশের কক্ষে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে দীর্ঘসময় ধরে গ্যাস জমে ছিল। সকালে পরিবারের সদস্যরা ঘুম থেকে ওঠার পর সিগারেটের লাইটার জ্বালানোর চেষ্টা করলে মুহূর্তেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয়রা জানান, বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। পরে তাদের ঢাকায় জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়। তাদের সবাইকে ভর্তি করা হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। তখনই তাদের অবস্থা ‘আশঙ্কাজনক’ ছিল বলে জানিয়েছিলেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শাওন বিন রহমান ।


১১ মে গৃহকর্তা মো. কালাম মারা যান; তার শরীরে পোড়ার মাত্রা ছিল ৯৫ শতাংশ। এরপর একে একে মারা যান কালাম-সায়মা দম্পতির তিন শিশু সন্তান মুন্না (৭), কথা (৪) ও মুন্নি (১০)। তাদের শরীরের যথাক্রমে ৩০ শতাংশ, ৫২ শতাংশ ও ৩৫ শতাংশ পুড়েছিল। শুক্রবার (১৫ মে) সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ৩২ বছর বয়সী নারী সায়মা মারা যান, তার শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন