নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পাড়া মহাল্লা থেকে শুরু সব জায়গায় ছেয়ে গেছে কিশোর গ্যাংয়ের মহরা। সেই সাথে শহরের অলি গলিতে জটলা বেধে উঠতি বয়সি কিশোরদের আড্ডা বেড়েছে। শীতলক্ষা নদীর পাড়ে বিকেল হলেই এক দল কিশোরদের আড্ডা শুরু হয়। এছাড়া মাদককারবাড়িরা আগের থেকে বেপরোয়া হয়ে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি র্যাব পুলিশের উপর হামলা করতেও কর্ণপাত করছে না। তাই সচেতন মহলের মাছে প্রশ্ন উঠেছে যেখানে প্রশাসন নিজেদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না সেখানে জনগণের নিরাপত্তা দিবে কি করে।
এনিয়ে মানুষের মাছে উদ্বেগ তৈরী হয়েছে। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনের পর থেকে প্রশাসন যে ভাবে ভেঙ্গে পড়েছে সেখান থেকে এখনো বের হতে পারে নাই। তার মাঝে বিএনপির নেতাকর্মীরা নানা অপকর্মে জরিয়ে যাচ্ছে। তাদেও আচরনে গত দুই মাসে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। তাছাড়া মাদক সন্ত্রাসীরা পাড়া মহল্লায় বেপরোয়া হয়ে গেছে। তাদেও বিরুদ্ধে প্রশাসন অভিযান চালাতে গিয়ে মার খেয়ে আহত হচ্ছে। এতে করে প্রশাসনের দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে।
এদিকে এক সময়ের সন্ত্রাসকবলিত নারায়ণগঞ্জ এখন কিশোর গ্যাংয়ের বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। আতঙ্ক হয়ে দাড়িয়েছে কিশোর অপরাধ। কখন কে এদের হাতে মারধর কিংবা হত্যার শিকার হয় তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। যদিও এক সময় রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কাছে তটস্থ থাকত নারায়ণগঞ্জের মানুষ। এখন আর তা নেই বললেই চলে। এখন ভয়ঙ্কর খুনের মিশনে নেমেছে কিশোর গ্যাং। বিশেষ করে মাদক ব্যবসায়ীরা কিশোরদের বিপদের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। মাদকের আড়ালে বিভিন্ন নামে পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে কিশোর সন্ত্রাস বাহিনী। অনেকে এলাকায় প্রভাবশালি ব্যক্তি সহ রাজনৈতিক নেতারা শেল্টার দেয় বলে ভুক্তভোগির অভিযোগ।
অপরদিকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে কিশোররা। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই থেকে শুরু করে খুনাখুনিসহ নানা অপরাধে কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে। অথচ কিশোর বয়সে বই নিয়ে বিদ্যালয়ের যাওয়ার কথা। সেখানে তার উল্টোট ঘটছে। কিশোররা এখন গ্যাং তৈরী করে বিভিন্ন অপরাধ করে বেরায়। মাদক কারবার ও দখলবাজিতেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
সম্প্রতি কিশোর সন্ত্রাসীদের হাতে প্রশাসনের উপর হামলার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবতা প্রকাশ পায়। তার মাঝে মঙ্গলবার (৫ মে) নারায়ণগঞ্জে পরপর দুটি গুরুতর ঘটনা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি ঘটনায় ডিবি (গোয়েন্দা) পুলিশ পরিচয়ে স্বর্ণ ছিনতাই, অন্য ঘটনায় র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা এই দুই ঘটনা একই দিনে ঘটায় জনমনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার লিংক রোডসংলগ্ন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার জালকুড়ি এলাকায়।
এখানে মালয়েশিয়া প্রবাসী এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ একটি চক্র নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে থামায়। পরে কৌশলে তার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় বোঝা যায়, অপরাধীরা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে আরও পরিকল্পিতভাবে অপরাধ সংঘটিত করছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
একই দিনে এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র্যাব) সদস্যদের ওপর হামলা চালায় মাদক ব্যবসায়ীদেও কিশোর গ্যাং বাহিনী। র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন জানান, এই হামলায় অন্তত তিনজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। ৫ মে দুপরে মাসদাইর বোয়ালিয়া খাল এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। কারা এবং কীভাবে এই হামলা চালিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।তাছাড়া গতকাল অভিযান চালিয়ে মাদকশারবারিদের গ্রেপ্তার করলেও মুলহোতারা ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হত্যা ও মাদকসহ ডজন খানেক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি এবং উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে অবরুদ্ধ করে প্রকাশ্যে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সোমবার (৪ মে) রাতে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। পুলিশের একটি অভিযানে শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলে তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের উপর হামলা চালায়।
তাছাড়া মাসদাইর এলাকা শহরের অন্যতম ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় এ এলাকাতে মাদক ব্যবসায়ীদের দাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পরাভূত হচ্ছে। সবশেষ ৫ মে মাসদাইর বোয়ালিয়া খাল এলাকাতের্ ্যাবের উপর হামলা করে একদল দুর্বৃত্ত। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে একদল অস্ত্রধারীর্ ্যাবের সাদা পোশাকে থাকা সদস্যদের উপর হামলা করে। এ ঘটনার পর ফের আলোচনায় এ জনপদের আরেক ত্রাস ভয়ঙ্কর মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদার খ্যাত জাহিদ।
ফতুল্লার মাসদাইর, ঘোষেরবাগ, গলাচিপা এলাকাতে একচ্ছত্রভাবে মাদক ব্যবসার নিয়স্ত্রক হলেন জাহিদ। জাহিদের নেতৃত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী ও ডাকাত। তাদেরকে দিয়ে বিভিন্নস্থানে এসব অপরাধগুলো করানো হয়।
অন্যুদিকে গত বছরের ১৬ নভেম্বর মাসদাইর এলাকায় প্রকাশ্যে হামলা ও গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী জাহিদকে ধরতে র্যাবের তৎপরতা টের পেয়ে ছোরা গুলিতে জবা নামে একজন নারী গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
এর আগে ১৫ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপর ছুরিকাঘাত ও গুলির ঘটনা ঘটায় জাহিদ ও তার সহযোগীরা।
গত বছরের ২৪ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সামছুল হক সরকার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাসদাইর ঘোষের বাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার করতে যান। জাহিদকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা যখন ফিরে আসছিলেন, তখনই পেছন থেকে জাহিদের সহযোগীরা এসআই সামছুল হক সরকারের ডান হাতের কনুইয়ের সামান্য নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ছুরিকাঘাতে আহত এসআই সামছুল হক সরকারকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
গত বছরের ১৮ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে আটক ৪ আসামিকে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সহযোগী মাদক ব্যবসায়ীরা। সেদিন মাসদাইর এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাহিদ, সুমনসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। তবে কিছুক্ষণ পর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সেলিম ওরফে কসাই সেলিম, রাসেল ওরফে কসাই রাসেল, কাজল, রিয়াদ শাওন, সানি, হাসান সহ ১৫-২০ জনের মাদক কারবারিরা দেশীয় তৈরি অস্ত্র নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালায়।
এ সময় হামলাকারীরা হ্যান্ডকাফ পরিহিত আটককৃত চার মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনিয়ে নেয় এবং গাড়ী ভাংচুর করে। মাদক কারবারিদের হামলায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কনেস্টেবল আহত হয়। হামলাকারীদের থেকে রক্ষা পেতে মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা এক শিক্ষকের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে ও হামলাকারীরা হামলা চালায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই হামলার শিকার হওয়ায় অপরাধীদের সাহস ও দুঃসাহসিকতার মাত্রা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংগঠিত অপরাধচক্র সক্রিয় এবং তারা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি হামলায় কিশোর অপরাধীরাই বেশি জরিত রয়েছে। দিনের পর দিন তারা এখন লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন তাদের লাগাম টেনে ধরতে না পাড়ায় নিজেরাই এখন মার খাচ্ছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে অভিভাবকরা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি প্রশাসনকেও বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে। পুলিশ প্রশাসন বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা রোধ করতে অভিভাবক, সুধীসমাজ, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, সমাজকল্যাণ অধিদফতরসহ সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কিশোর বয়সে ছেলে মেয়েরা থাকবে শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। গুটি কয়েক কিশোররা ‘মোড়ে মোড়ে জটলা পাকিয়ে শক্তি প্রদর্শন দেখাতে চায়। সেই সাথে ক্ষিপ্রগতিতে মোটরসাইকেল দাবড়িয়ে বেড়ানো, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। এদের দমন করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই গ্যাং বড় সন্ত্রাসী হয়ে উঠবে। এদের রুখতে হলে বা সংশোধন করতে হলে প্রশাসনকে ও তাদের অভিভাবকদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে চরম মূল্য দিতে হবে।