# ঘুষ এখন আদালতের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে
দেশে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আইন আদালতে কর্মরত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্থ গ্রহণ করে তাদের কে দেশের অধিকাংশ মানুষ ঘুষখোর বলে আখ্যায়িত করেন। সেবা গ্রহণকারী জনগণের প্রয়োজনীয় ফাইল আটকিয়ে অথবা বিভিন্ন বাহানায় অজুহাত দেখিয়ে যারা অর্থের বিনিময়ে সে কাজ করে দেয় তাদের এই অনৈতিক ও বেআইনিভাবে অর্থ গ্রহণকে ভুক্তভোগীরা ঘুষ বাণিজ্য বলে থাকেন। অথচ যথাসময়ে এই কাজটি করে দেয়া এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বাধীন কাজ ছিল।
প্রতিটি সভ্য দেশেই যেকোনো অপরাধ ও তার শাস্তি বোধগম্য আইনি ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায় সে দেশের প্রচলিত আইনগুলোতে। যথাযথ আইনের প্রয়োগ এবং যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে সে অপরাধের মূল উৎপাটন সহজ হয়। আবার আইন আছে তবে জনগণের বোধগম্য ভাষায় নয়-তাহলে সে অপরাধ কিভাবে নির্মূল সম্ভব?
সুপ্রিয় পাঠক, দেশের প্রতিটি সেবা খাতে যে হারে ঘুষ বাণিজ্য ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে- তা নির্মূল বা অবসান ঘটাতে দেশে প্রচলিত আইনগুলোতে আলোচিত ঘুষ শব্দটি কোন আইনেই খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমানে দেশে প্রচলিত মূল দণ্ডবিধ আইন ১৮৬০ এ ঘুষ সংক্রান্ত অপরাধকে ইংরেজিতে গ্র্যাটিফিকেশন নামে অভিহিত করা হয়েছে। যার বাংলা অর্থ করা হয়েছে উৎকোচ বা সন্তুষ্টকরন। অনুরূপভাবে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে ঘুষ শব্দটি ইংরেজিতে লেখা হয়েছে ক্রিমিনাল মিসকন্ডাক্ট যা বাংলায় লেখা হয় অপরাধ মূলক অসদাচরণ। একইভাবে দেশের আলোচিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে ঘুষকে বলা হয়েছে করাপশন-অর্থাৎ দুর্নীতি। অথচ আমাদের দেশ এবং সমাজে ইংরেজিতে ব্রাইব (ইৎরাব) শব্দটি বাংলায় ঘুষ শব্দের খুব কাছাকাছি বলেই মনে হয়।
অনেকে প্রশ্ন তোলেন দেশে প্রচলিত আইন গুলিতে যেখানে ঘুষখোরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না সেখানে ঘুষ খাওয়া কেন অপরাধ হবে ? উৎকোচ বা সন্তুষ্টকরন, অপরাধ মূলক অসদাচরণ অথবা দুর্নীতি নামক এই শব্দগুলোকে দেশের আপামর জনগণের কতজন ঘুষ বা ঘুষখোর শব্দের সমার্থবোধক বলে মনে করেন। অথচ দেশের অধিকাংশ প্রান্তিক মানুষ ঘুষ ও ঘুষখোর শব্দটি অতি সহজেই বুঝতে পারেন। উল্লেখিত আইনগুলোতে যদি ঘুষ ও ঘুষ গ্রহীতা কে ঘুষখোর হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো তাহলে এই অনৈতিক বেআইনী কাজের সাথে জড়িতরা তাদের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন ও সভ্য সমাজে একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হতো- বলে দেশের বোদ্ধামহল মনে করেন।
তাদের ধারণা উক্ত আইনগুলো যারা প্রণয়ন করেছেন যারা এইগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন তাদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঘুষ লেনদেনের সাথে জড়িত। অফিস আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী নামক শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষগুলোই প্রবলভাবে ঘুষ বাণিজ্যর সাথে জড়িত রয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে বিতর্কিত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ঘুষ কে ‘স্পিডমানি’ বলে উল্লেখ করতে লজ্জাবোধ করেননি। অর্থাৎ ঘুষ দিলে নাকি কাজের গতি বাড়ে।
২০১০ সালে বাংলাদেশ টিআইবি, (ট্রান্স্পারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) তাদের এক জরিপে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কে দুর্নীতির শীর্ষে বলে উল্লেখ করেছিল। এই জরিপ রিপোর্ট নিয়ে সে সময় যথেষ্ট হৈচৈ ও হয়েছিল। এমনকি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ টিআইবির বিরুদ্ধে আদালতে মানহানির মামলাও করেছিলেন। সেই বছরের ১৮ ডিসেম্বর এ ব্যাপারে কয়েকটি জাতীয় দৈনিক তাদের জনমত জরিপ প্রকাশ করেছিল।
দৈনিক প্রথম আলো পাঠকদের প্রশ্ন করেছিল। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ বিচার বিভাগের দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার-টিআইবি’র এই জরিপ প্রতিবেদন তারা সমর্থন করেন কিনা ? উত্তরে ৯৬.৭৫ শতাংশ পাঠক হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়েছিলেন। ফলে তৎকালীন সরকার জনমতের চাপে সেই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। ডক্টর ইউনুস এর অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমদ রাজধানীর আগারগাঁও রাজস্ব ভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছিলেন দেশের সেবা খাত সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত আমি উপদেষ্টা হওয়ার আগে নিজেই বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়েছিলাম কারণ কাজটি যাতে সময় মত হয়।
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দেশের এক তৃতীয়াংশ সেবা গ্রহীতা ঘুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের ২০২৫ এর সিটিজেন পারসেপশন সার্ভেতে উল্লেখ করেছে সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষ এখনো একটি প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেখ হাসিনার শাসন আমলে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির অভিষেক অনুষ্ঠানে তৎকালীন আইনমন্ত্রী মরহুম আব্দুল মতিন খসরু আদালতে ঘুষ বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, আদালতে মামলা করতে আসা বিচার প্রার্থীদের ১৮ জায়গায় ঘুষ দিতে হয়। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই একথা বলছি।
একজন প্রবীন আইনজীবী জানান, আদালতের বিচার পদ্ধতির কারণে ঘুষ প্রদান এখন একটি অলিখিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে-এটা ওপেন সিক্রেট। তিনি ঘুষের শ্রেণী বিন্যাস করে বলেন, একটি নতুন মামলা দায়ের করতে গেলে প্রথমে সেরেস্তাদারকে দিতে হয় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। পিয়নকে দিতে হবে ১০০ টাকা, সমনজারি করতে সার্ভার কে দিতে হবে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। এছাড়া কোর্টের পেশকার পিয়নকে মামলার শুনানির জন্য খরচ অর্থাৎ ঘুষ দিতে হয়। মামলার একটি রায়ের কপি পেতে হলে দিতে হয় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। ফলে একজন বিচারপ্রার্থীকে চরম আর্থিক দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। আদালতগুলোতে সরকার নিযুক্ত আইনজীবীকে জামিন শুনানি করতে অথবা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ করতেও নির্দিষ্ট হারে ঘুষ দিতে হয়। কোন ছাড় নয়। আইনজীবী মহোদয় রহস্য করে একটি গানের কলি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘বর্তমানে কোর্টে বিচার চলে নোটে।’
এখন নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের এজলাসের বাইরে দরজায় একটি বিজ্ঞপ্তি সেটে দেওয়া হয়েছে যেখানে লেখা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার যেকোনো আদালত-ট্রাইব্যুনালে বিচারিক সেবা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা বা কোন অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ থাকলে নিম্নে বর্ণিত মোবাইল নম্বরে অফিস চলাকালে নিজের পরিচয় দিয়ে কল করুন। মনে পড়ে ২০২৩ সালের ১১ই মে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুরূপ একটি বিজ্ঞপ্তির কথা।
হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি বিশ্বজিৎ দেবনাথ এর বেঞ্চের এক এজলাস কক্ষের বাইরে টাঙ্গানো একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল অএ কোর্টের (বেঞ্চের) কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী কোন বকশিশ বা টিপস নেয়ার নামে কোন প্রকার অর্থ, উপহার সামগ্রী গাড়ি সেবা অন্য কোন প্রকার অর্থ উপহার নেওয়া কে দুর্নীতি বলে গণ্য হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লক্ষণীয় বিজ্ঞপ্তি দুটিতে ঘুষ শব্দটি খুব সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এ বিজ্ঞপ্তির কারণে কতটা ঘুষ দুর্নীতি কমেছে-তা ভুক্তভোগী বিচার প্রার্থী ও আইনজীবীরাই বলতে পারবেন। দেশের আইন আদালত কে গরিব অসহায় নির্যাতিত অধিকার হারা মজলুম মানুষদের শেষ ভরসাস্থল বলা হয়। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য গতিতে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত গুলোতে ঘুষবাণিজ্য বেড়ে চলায় জনগণের কাক্সিক্ষত আইনের শাসন জাস্টিস ন্যায়বিচার ও ইনসাফ পূর্ণসমাজ বিনির্মাণের ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন-স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে।
পাদটিকা:
বণিক রুপি ধূর্ত ইংরেজরা এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসে ক্ষমতালোভি মীরজাফর, অর্থলোভী উমিচাদ, রায় দুর্লভ ও জগত শেঠদের হাত করে এদেশের শাসন-ক্ষমতা কড়ায়ত্ত করেছিল। এদেশে তারাই ঘুষের লেনদেন শুরু করেছিল। ১৭৭৫ সালে তৎকালীন ভারতবর্ষের ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস-মীরজাফরের পত্নী মুন্নি বেগমের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে মহারাজ নন্দকুমার লন্ডনের সুপ্রিম কাউন্সিলে বক্তব্য রাখার সময় গভর্নরের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এনেছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পিট তদন্ত সাপেক্ষে গভর্নর কে ‘ইমপিচ’ করেছিলেন। "শোন হে সুজন যে জান সন্ধান "। লেখক : আইনজীবী, সাংবাদিক।