# বাম-ডান বুঝি না, জনগণের স্বার্থে ফুটপাত হকারমুক্ত থাকবে : টিপু
# হকার ইস্যুতে রাজনীতি নয় : রফিউর রাব্বি
# প্রশাসন ব্যর্থ হলে হকারদের প্রতিহত করতে জনগণ নামবে : এড.মাসুম
# অঞ্জন ও ইকবাল চাাঁদাবাজ তাদের গ্রেফতার চাই : আবু সাউদ মাসুদ
# "চাঁদাবাজ ছাড়া কেউ হকারদের পক্ষে থাকতে পারে না : পন্টি
# দলীয় সিদ্ধান্ত ভেঙে হকারদের পক্ষে গিয়েছে অঞ্জন : তরিকুল সুজন
স্বার্থ ছাড়া কেউ তুলার বোঝা বহে না বাক্যটি তেঁতো হলে ও সত্য। যা গতকাল 'পুনর্বাসনের’ নামে হকারদের নিয়ে নাটকঞ্চস্থ করে দেখিয়েছেন শ্রমিকদের পক্ষে আন্দোলন করা বাম নেতারা। যা পুরোই সামনে তুলে এসেছে যে স্বার্থ হাসিলেই তারা সর্বদা আন্দোলন নামক নাটকে ঝাঁপিয়ে পরে। এদিকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক ও ফুটপাত থেকে উচ্ছেদের এক সপ্তাহ পেরোতেই পুনর্বাসনের দাবিতে সড়কে বাম নেতারা উস্কানি দিয়ে নামিয়েছেন।
তারা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও নগরভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেছেন। নগরবাসীর হাত থেকে স্বস্তি¡ কেড়ে নিতে মাঠে নামা বাম নেতাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে নগরবাসী। এদিকে গতকাল সোমবার (২০ এপ্রিল) বেলা এগারোটার দিকে শহরের চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন কয়েকশ হকার। পরে তারা 'পুনর্বাসনের আগে হকার উচ্ছেদ চলবে না' - স্লোগানে মিছিল নিয়ে নিতাইগঞ্জে নগরভবনের সামনে সমাবেশ করেন।
এতে জেলা হকার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে এ মিছিলে হকারদের নেতৃত্ব দেন জাতীয়তাবাদী হকার্স ইউনিয়ন দলের সভাপতি কেএম মিজানুর রহমান রনি ও জেলা হকার ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম। এতে আরও উপস্থিত জেলা হকার ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শুক্কুর, হকার্স ইউনিয়ন দলের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন, সিনিয়র সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম পাটোয়ারী, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সুমন, দপ্তর সম্পাদক রনি আহমেদ অপু প্রমুখ।
সংহতি জানিয়ে হকারদের মিছিলে ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী সমন্বয়কারী অঞ্জন দাস ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন। হকাররা মিছিল শেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের কাছে ৫ দফা দাবিতে একটি স্মারকলিপিও দেন। এতে তারা হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ না করা এবং দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ও ছুটির দিনে ফুটপাতের একাংশে বসার সুযোগ করে দেবার দাবি জানান। এ সময় হকারদের পক্ষে প্রকাশ্যে অঞ্জন দাস ও ইকবালকে দেখে হতভাগ হয় নগরবাসী।
নগরবাসী অনেকের মুখে শোনা যায়, তারা আলোচনা তুলছেন এই অঞ্জন দাস ও ইকবাল তো হকার উচ্ছেদের দিন সংহতি জানিয়ে হকার উচ্ছেদের পক্ষে মিছিল করেছেন। তারাই আবার এখন হকার ফের পুণবার্সনের দাবি মাঠে নেমেছেন। বিষয়টি গভীর বলছে অনেকেই। তা ছাড়া নগরবাসী ও বর্তমানে এই বাম নেতাদের উপর থেকে বিশ্বাস উঠিয়ে দিচ্ছেন।
এদিকে গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা দিয়ে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক, নবাব সলিমউল্লাহ সড়ক ও নবাব সিরাজউদ্দোল্লা সড়কের হকারদের উচ্ছেদে নামে। যদিও সেদিন হকারদের বড় একটি অংশ আগেই নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। সিটি প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে জেলা পুলিশ, র্যাব, আনসার ও স্কাউট সদস্যরা উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেন।বিএনপি, গণসংহতি আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও সেদিন উচ্ছেদে ঐকমত্য পোষণ করেন।
গত কয়েকদিন সড়ক ও ফুটপাতে সিটি কর্পোরেশনের টানা উচ্ছেদ অভিযান চলছে।হকাররা কেউ কেউ বসার সুযোগ খুঁজেও সিটি কর্পোরেশনের কর্মী ও পুলিশ সদস্যদের তৎপরতা তা হয়ে ওঠেনি। এ পরিস্থিতি চলেছে গত এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ পেরোনোর পরই সোমবার পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ না করার দাবিতে মিছিল করলেন হকাররা।
তারা বলেন, গত ১৩ এপ্রিল সিটি কর্পোরেশন পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না করেই মহানগরের ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদে অভিযান চালায়। এতে হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েন হাজারো হকার। অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। গণসংহতি আন্দোলনের নেতা অঞ্জন দাস বলেন, “আমরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নই, তবে পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা এসব মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।”
এদিকে, ফুটপাত হকারমুক্ত থাকায় গত কʼদিন স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করেছেন নগরবাসী। হকারমুক্ত ফুটপাতের দাবি ছিল তাদের। হকারদের মিছিল ও পুনরায় ফুটপাতে বসার দাবি ক্ষুব্ধ করেছে নগরবাসীকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। হকারদের সঙ্গে সংহতি জানানো রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ফুটপাত হকারমুক্তই থাকবে। তারা নির্বিঘ্নে শহরে হাঁটতে চান। বর্তমানে বাম নেতারা নগরবাসীর চোখের বিষ হয়ে উঠছেন এই অঞ্জন ও ইকবাল কান্ডে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এডভোকেট মো. আবু আল ইউসুফ খান টিপু ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, আমরা ডান-বাম বুঝি না, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের জনগণের স্বার্থে ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা হবেই। কোনো মিছিল ও মিটিংয়ে কাজ হবে না। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের জনগণকে ওয়াদা করেছে যে, ফুটপাত হকারমুক্ত করার জন্য হকারদের উচ্ছেদ করা হয়েছেÑতা বলবৎ থাকবেই।
তিনি আরও বলেন, তবে যে সকল হকার আমাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে জনগণের স্বার্থে ফুটপাতে বসবে না, তাদেরকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ভোটারদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু কোনো উল্টো-পাল্টা করলে কোনো কাজ হবে না এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটালে তা প্রতিহত করা হবে ও শক্ত হাতে দমন করা হবে।
তিনি বলেন, আশা করি, যারা হকারমুক্ত আন্দোলনে যে সকল রাজনৈতিক দল একাত্মতা ঘোষণা দিয়েছেন, তারা পেছনে গিয়ে কোনো নাটক করবে না ও কোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত হবেন না।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে হকারদের নিয়ে রাজনীতি একটি পুরোনো বিষয় এবং অতীতে এ ইস্যুতে অনেকেই নিজেদের চাঁদাবাজি আড়াল করতে মানবতার কথা বলেছেন। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতি যারা করেন তারা শ্রমিকবান্ধব হবেনÑএটা স্বাভাবিক। তবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার ফলাফল শেষ পর্যন্ত জনজীবনেই পড়ে।
তিনি আরও বলেন, হকারদের পুনর্বাসনের পক্ষে তিনি আছেন, তবে তা অবশ্যই নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় ঝড়, বন্যা, খরা ও দারিদ্র্েযর কারণে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে, যার বড় অংশ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে আসছে। এসব মানুষের একটি বড় অংশ হকারি, রিকশা চালানো এবং গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছে।
রফিউর রাব্বি বলেন, বাস্তুভিটা হারানো মানুষের এই চাপ নারায়ণগঞ্জ কতটা নিতে পারবে তা বিবেচনা না করলে শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হবে এবং শহর অচল হয়ে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ফুটপাত দখল করে হকার বসানো যানজটের একমাত্র কারণ নয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। “পথের প্রথম অধিকার পথিকের”Ñএই নীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো অজুহাতেই সাধারণ মানুষকে তার চলাচলের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, শহরকে জনবান্ধব করতে সকলের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন, এবং শহরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহাবুবুর রহমান মাসুম বলেছেন, প্রশাসন ব্যর্থ হলে হকারদের প্রতিহত করতে নারায়ণগঞ্জের মানুষ রাস্তায় নামবে নারায়ণগঞ্জ শহরকে নিয়ে আর কোনো ছিনিমিনি বরদাশত করা হবে না! হকারদের ‘রাজত্ব’ হটাতে এবার প্রশাসনকে চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হলো।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নাগরিকদের অধিকার হরণ করে ফুটপাতে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। পুনর্বাসনের নামে কোনো রাজনৈতিক নেতার ফায়দা লোটার সুযোগ নেই। যদি প্রশাসন হকার সরাতে ব্যর্থ হয়, তবে নারায়ণগঞ্জবাসী নিজেরাই রাজপথে নামতে বাধ্য হবে!
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাউদ মাসুদ বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদের সময় যারা ধাক্কাধাক্কি করে ছবির ফ্রেমে জায়গা নেয়, তারাই আবার হকারদের উস্কানি দিচ্ছে। অঞ্জন ও ইকবালের মতো ‘দ্বিমুখী’ রাজনীতিকদের নারায়ণগঞ্জবাসী চিনে ফেলেছে। জনস্বার্থ রক্ষায় এই দুই চাঁদাবাজের অবিলম্বে গ্রেপ্তার দাবি জানাই।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেছেন, হকার নয়, এরা স্থায়ী দখলবাজ; পৈত্রিক সম্পত্তির মতো ফুটপাত ভোগ করেছে" হকারদের ‘মগের মুল্লুক’ নিয়ে এবার গর্জে উঠা দরকার। যারা ফুটপাত দখল করে সাধারণ মানুষের পথ রুদ্ধ করছে, তাদের আর ছাড় নয়। উস্কানিদাতাদের এখনই থামানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেনÑ "চাঁদাবাজ ছাড়া কেউ হকারদের পক্ষে থাকতে পারে না।"
গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়কারী তারিকুল সুজন বলেন, গত ১৩ এপ্রিল, হকার উচ্ছেদের পক্ষে মাঠে নামা ছিল আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। সেখানে গণসংহতি আন্দোলনের জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ, মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দসহ ছাত্র ফেডারেশনেন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিল।
আজ ২০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা হকার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে যে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই ব্যানারের সাথে গণসংহতি আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নাই। একই সাথে সেই ব্যানারের নেতৃত্বের মধ্যে অঞ্জন দাসও একজন। ১৩ এপ্রিল তিনি নিজে হকার উচ্ছেদের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন এবং হকার উচ্ছেদের পক্ষেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। তার আজকের অবস্থানের সাথে গণসংহতি আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নাই। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে আজ তিনি হকারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এটা তার ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত, দলীয় সিদ্ধান্ত নয়।
তিনি আরো বলেন, আজ সন্ধ্যা ৭ টায় জেলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এবং সভায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারনে অঞ্জন দাসের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে অনুরোধ জানানো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি আধুনিক নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে গণসংহতি আন্দোলন দীর্ঘদিন কাজ করছে। গুম-খুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের নেতা কর্মীরা জানবাজি রেখে লড়াই করেছি। নগরবাসী হকার উচ্ছেদ চায় কারণ নগরবাসী পরিকল্পিত এবং পরিচ্ছন্ন নারায়ণগঞ্জে তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। নগরবাসীর স্বার্থের বাইরে গণসংহতি আন্দোলনের আলাদা স্বার্থ নাই। নগরবাসীর স্বার্থই গণসংহতি আন্দোলনের স্বার্থ।