Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

ভোট বাড়াতে কারসাজি

কাউন্সিলর ছক্কুর বাড়িতে ৩১৮ ভোটার, অস্বাভাবিক বলছে ইসি

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

কাউন্সিলর ছক্কুর বাড়িতে ৩১৮ ভোটার, অস্বাভাবিক বলছে ইসি

কাউন্সিলর ছক্কুর বাড়িতে ৩১৮ ভোটার, অস্বাভাবিক বলছে ইসি

Swapno



নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের খানপুর মোকরবা রোডের ৫৬ নম্বর হোল্ডিং-এর একটি টিনসেড বাড়ি। এ বাড়িতে ভাড়া থাকেন মাত্র পাঁচটি পরিবার। কিন্তু এ বাড়ির ঠিকানায় ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন ১৮২ জন। একই সড়কে আরেকটি তিনতলা বাড়িতে থাকেন ছয়টি পরিবার। যাদের মধ্যে বাড়িওয়ালা ও তার ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। এ বাড়ির ঠিকানাতেও ১৩৬ জন ভোটার তালিকাভুক্ত আছেন। এ বাড়ি দু’টির মালিক একই ব্যক্তি- অহিদুল ইসলাম ছক্কু যিনি সদ্য সাবেক কাউন্সিলর।


একই সড়কের আরও দু’টি বাড়িতে ১২০ জন ভোটার তালিকাভুক্ত। নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, একই হোল্ডিং-এ এত ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক। বাড়ির ধরণ ও স্বাভাবিকতার হিসেবে এখানে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ জনের বেশি ভোটার তালিকাভুক্ত থাকার কথা না। কীভাবে এমনটা হয়েছে তা তারাও যাচাই-বাছাই করার প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই হোল্ডিং-এ অস্বাভাবিক ভোটার থাকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তারা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনেও তুলেছিল।


গত ১২ ফেব্রুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার আগে ২৪ নভেম্বর ভোটার তালিকা প্রকাশ করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। ওই তালিকায় নারায়ণগঞ্জ নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ‘নগর খানপুর’ বলে পরিচিত এলাকার মোকরবা রোডের ৫৬, ৪৩/১, ৪৯ ও ৫১ হোল্ডিং নম্বরের ঠিকানায় ৪৩৮ জন ভোটার তালিকুভুক্ত হয়েছেন। যদিও এ এলাকায় মোট ভোটারই রয়েছেন ১৩৩৬ জন।
নির্বাচন অফিস সূত্র বলছে, ওই চার হোল্ডিং নম্বরের ঠিকানায় নিবন্ধিত ভোটারদের কেউ কেউ সর্বশেষ হালনাগাদ ভোটার তালিকায় যুক্ত হলেও অনেকে আগেই ভোটার হয়েছেন। কিন্তু তাদের ঠিকানা হিসেবে এই হোল্ডিং নম্বরের বাড়িগুলো উল্লেখ রয়েছে।


এদিকে, চার বাড়ির দু’টির মালিক অহিদুল ইসলাম ছক্কু স্থানীয় বিএনপি নেতা। একটি বাড়িতে তিনি নিজেই থাকেন। অপর টিনসেড বাড়িটি ভাড়া দেওয়া এবং সেখানেই তার কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।
সরেজমিনে মোকরবা রোডের ৫৬ নম্বর হোল্ডিং-এর বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একপাশে আছে কাউন্সিলরের কার্যালয়। এবং অপরপাশের ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া। সেখানে থাকেন পাঁচটি পরিবার। তারা সকলেই কর্মজীবী। কেউই স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাদের অনেকে এ ওয়ার্ডের ভোটারও নন।


এ বাড়ির ভাড়াটিয়া রেস্তোরাঁ কর্মী মো. তানভীরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দেড় বছর আগে এই ভাড়া বাড়িতে ওঠেন তারা। তবে, এই বাড়ির ঠিকানায় তারা ভোটার হননি। তানভীর নিজে এখনো ভোটার হননি, তবে তার মা তাসলিমার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখান। সেখানে ঠিকানা হিসেবে পাশের এলাকা পশ্চিম তল্লার ‘দুলু মিয়ার বাড়ি’ উল্লেখ রয়েছে। তাদের স্থায়ী ঠিকানা পটুয়াখালী জেলায়। এই বাড়িতে আরও ১৬ জন থাকেন। তাদের মধ্যে অনুর্ধ্ব ১৫ বছর বয়সী দুইজন সদস্য রয়েছেন। যারা এখনো ভোটার হননি।কিন্তু সাবেক কাউন্সিলর অহিদুল ইসলাম ছক্কুর এ বাড়িটিতে ভোটার তালিকাভুক্ত আছেন ১৮২ জন।


কয়েক কদম এগিয়ে গেলে অহিদুলের আরও একটি তিনতলা রয়েছে। এ বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ৪৩/১ মোকরবা রোড। পুরোনো নকশার এ বাড়িটির একটি ফ্ল্যাটে নিজেই থাকেন অহিদুল, অপর একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন তার ভাই। এছাড়া, আরও চারটি পরিবার বাড়িটিতে ভাড়া থাকেন। এ বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. হাসান বলেন, তার পরিবারে তিনজন সদস্য। তিনি নিজে গাজীপুরের ভোটার হলেও স্ত্রী আকলিমা এ ওয়ার্ডের ভোটার। কিন্তু তার ঠিকানা ৩০ নম্বর মোকরবা রোড।


একই ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর হোল্ডিং-এ গত ১০ বছর ধরে ভাড়া থাকছেন চারটি পরিবার। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা মোট ১৪ জন। যাদের মধ্যে দু’জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং একজন ভোটার হয়েছেন গত বছর। বাকিরা আগেই ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এ হোল্ডিং নম্বরে ভোটার তালিকাভুক্ত আছেন ৪৭ জন। বিষয়টি শুনে অবাক হন এ বাড়ির বাসিন্দা আফরোজা আক্তার। মধ্যবয়সী এ নারীর বোন পিয়ারি আক্তারও এ বাড়ির ভাড়াটিয়া। আফরোজা বলেন, “আমরা এ বাড়িতে অনেক বছর ধরে থাকি। এইখানেই ভাড়া থাকছি। নতুন কেউ ভাড়াটিয়া এইখানে আসার তো কোনো কারণই নাই।”


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মোকরবা রোড খানপুর এলাকার মোট ভোটার ১৩৩৬ জন। যার মধ্যে নারী ভোটার ৭০০ এবং পুরুষ ভোটার ৬৩৬ জন। এই ভোটার সংখ্যার মধ্যে চারটি হোল্ডিং-এ ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন ৪৩৮ জন। যা অস্বাভাবিক বলে জানাচ্ছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।


জেলা নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তার কাছে এ এলাকার ভোটার তালিকা নিয়ে যাওয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ ভোটারদের যাচাইকারী ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সত্যয়নকারী অহিদুল ইসলাম ছক্কু।


উদাহরণ হিসেবে মোকরবা রোডের ৫৬ হোল্ডিং নম্বরের ঠিকানায় ২০২৩ সালে ভোটার হন অভয় চৌহান। তার স্থায়ী ঠিকানা সিলেটের হবিগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জের একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন তিনি। তার কাগজপত্র সত্যায়িত করেছেন অহিদুল। তিনি ওই সময় ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশের সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের সরিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, “একই হোল্ডিং-এ বেশি ভোটার হতে পারেন কিন্তু সেক্ষেত্রে ওই বাড়ির পরিধি এবং বাসিন্দাদের সংখ্যার উপর নির্ভর করে। কিন্তু এই ওয়ার্ডের বিষয়টি অস্বাভাবিক। কেননা বাড়িগুলোতে এই পরিমাণ ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া, যারা ছয় মাস কিংবা এক বছরের জন্য কোথাও ভাড়া থাকেন তারা ওই ঠিকানায় ভোটার হতে খুব একটা উৎসাহীও হন না।”


এ ধরনের কাজ সাধারণত ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমের সময় হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে মন্তব্য করে এই কর্মকর্তা বলেন, “একই হোল্ডিং নম্বরে ভোটার করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকে। কেননা, এতে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষজনের ভোটগুলো রিজার্ভ থাকে, যা ভোটের সময় বেনিফিট দেয়।”


এদিকে, ওই ওয়ার্ডের জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মো. খোরশেদ আলমও বলছেন, “ভোটার নিবন্ধনের সময় এই কারসাজি করেছেন অহিদুল ইসলাম ছক্কু। তিনি যখন কাউন্সিলর ছিলেন তখন এই কাজটি বেশি করেছেন। শুধু তার বাড়িই না, তার আত্মীয় ও বন্ধুর বাড়িতেও সে এইভাবে ভোটার করেছেন বলে জেনেছি। এবং ওই ভোটারদের তিনি নানা সুযোগ-সুবিধাও দিয়ে থাকেন যাতে ভোটের সময় তিনি সুবিধা নিতে পারেন। ফিক্সড ভোটার করার কারসাজি এটি।”


খোরশেদ আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এ ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীও। তিনি বলেন, একই হোল্ডিং-এ অস্বাভাবিক ভোটার নিবন্ধনের বিষয়টি তিনি দলে আলোচনা করবেন এবং এ বিষয়ে প্রতিকারের দাবি জানাবেন নির্বাচন কমিশনে।


যোগাযোগ করা হলে অহিদুল ইসলাম ছক্কু একই হোল্ডিং-এ বেশি পরিমাণে ভোটার নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কাজের সুবাদে এলাকায় থাকা অস্থায়ী ভাড়াটিয়াদের সহযোগিতা করার জন্য তিনি নিজের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে ভোটার নিবন্ধন করিয়েছেন।


“ভোটার হতে বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স, বিদ্যুৎ বিল লাগে। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা অনেক সময় বাড়িওয়ালার কাছ থেকে এগুলো পান না। আমি যেহেতু কাউন্সিলর তাই লোকজনকে সহযোগিতা করেছি মাত্র।” তবে, নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই কাজ করেননি দাবি করে বলেন, “এই কাজে আইনি কোনো বাধা নেই।


এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এটিকে ‘ভোটার কারসাজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই ওয়ার্ডের এক নেতা বলেন, “এভাবে ফিক্সড ভোটার তৈরি করা হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।” তাই নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগেই ভোটার যাচাই বাছাই করার দাবি করেছেন তিনি।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন