# এবার উচ্ছেদ নয়, ফুটপাত পরিষ্কার করা হবে : সাখাওয়াত
# না.গঞ্জে চাঁদাবাজি করে কিছু সন্ত্রাসী, যাদের কোন দল নাই : টিপু
# পুলিশ ও নেতাদের টাকা দিয়েই হকার বসে : রফিউর রাব্বি
# অতীতে হকার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি: মাসুম বিল্লাহ
# ব্যাক্তিগত নয় জনগণের স্বার্থ দেখে হকার উচ্ছেদ করতে হবে : মাওলানা আউয়াল
# উচ্ছেদ মানেই উচ্ছেদ হকারদের পুনর্বাসনের কথা উঠবে না : আশা
# হকার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কারা জড়িত তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে : শওকত আলী
আগামী (১৩ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জ শহরের বিবি রোড ও নবাব সলিমউল্লাহ সড়কের ফুটপাত দখল করে বসা হকার উচ্ছেদ করে তা নগরবাসীর চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক)। নগরবাসীর স্বস্তির বিষয়ে বিবেচনা করায় নাসিকের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এতে ঐকমত্য পোষণ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। সকলেই আগামী (১৩ এপ্রিল) হকার উচ্ছেদের দিনসহ পরবর্তীতে প্রশাসকের নেওয়া নগরবাসীর স্বার্থের সকল উদ্যোগে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
গতকাল শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেলে নগরভবনের মিলনায়তনে মতবিনিময় সভার আহ্বান করেন নাসিক প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান। এতে বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, বাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, জেএসডি, ইসলামী আন্দোলন, সাম্যবাদী দল ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের ৩২ জন প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেন।
সভায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, আগামী ১৩ তারিখে আমরা ফুটপাত পরিষ্কার করবো। আমরা শক্তি প্রয়োগে করায় বিশ্বাসী নয়। আগের দিন মাইকিং করব। পরে পর্যায়ক্রমে জিয়া হল থেকে বাপ্পি চত্তর, চাষাঢ়া মোড় থেকে খানপুর হাসপাতাল পর্যন্ত পরিষ্কার করবো। হকাররা আমাদের ভাই, তাদের মূল্যায়ন করতে চাই কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ইতোপূর্বে সিটি কর্পোরেশন থেকে তাদেরকে পূর্ণবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই জায়গা তারা আর্থিক বিনিময়ে হস্তান্তর করেছে। হস্তান্তর করে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। সুতরাং সেই মার্কেট আমি ভেঙ্গে দিব। ভেঙ্গে দিয়ে হকারদের বসার ব্যবস্থা করবো।
তিনি বলেন, আজকে আলোচনার বিষয়বস্তু নারায়ণগঞ্জের সকল মানুষের সমস্যা। সিটি কর্পোরেশনের সবাই সমান, আমি একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি প্রশাসক হিসেবে সকল দলের নেতৃবৃন্দকে সমানভাবে ট্রিট করার চেষ্টা করবো। আমি সকল নাগরিকের প্রশাসক হতে চাই এবং সকল নাগরিকের সাথে আমি কথা বলতে চাই। সকলকে নিয়ে সমস্যা সমাধান করতে চাই। আমি সকলের সহযোগিতা চাই। সকলের সহযোগিতা কামনা করে উচ্ছেদ অভিযানে সকলকে সংযুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, মার্কেট, দোকানদার, আড়ৎদার সমিতি সাথে মতবিনিময় করেছি। তারা সমর্থন জানিয়েছেন। হকার মার্কেট উচ্ছেদের পর প্রত্যেক মার্কেটেকে চিঠি দেয়া হবে। মার্কেটের সামনে যদি হকার বসে সেটা দায় দায়িত্ব সেই মার্কেটকে বহন করতে হবে। কোন বাধা সৃষ্টি হলে, সিটি কর্পোরেশন, প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়াবে। আমাদের দলের ‘হকারস ইউনিয়ন’ নামে একটি সংগঠন ছিল। সেই ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে।
উড়াল ট্রেন হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের যানজট, যাতায়াত সমস্যা সমাধান করতে হলে ট্রেনের কোন বিকল্প নাই। সব জায়গায় ট্রেন লাইন নির্মাণ করতে হবে। নারায়ণগঞ্জকে প্রাথমিকভাবে ট্রেন লাইনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উনি নির্দেশ দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে উড়াল ট্রেন বাপ্পি চত্তর থেকে সাইনবোর্ড, মদনগঞ্জ থেকে মদনপুর এবং আরেকটা পঞ্চবটি থেকে দুই নম্বর গেট রেল লাইনের সাথে যুক্ত হবে।”
সাখাওয়াত হোসেন খান আসার পর একটিও অটো লাইসেন্স দেননি মন্তব্য করে বলেন, নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত আমি কোন প্লেট কাউকে দিব না। কিন্তু ইতোপূর্বে যেই প্লেটগুলি দেওয়া হয়েছে সেই প্লেট আমি পর্যালোচনা করবো। লিস্টে দেখেছি সর্বোচ্চ একজনের নামে ৩০০ প্লেট আছে। কারো নামে ১০০, ৬০-৭০ প্লেট আছে। পর্যালোচনা করে কি সিদ্ধান্ত নিবে এটা আপনারা বুঝে নেন।
তিনি আরো বলেন,“নারায়ণগঞ্জে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ অটো এখানে প্রবেশ করে। কিন্তু ২০ থেকে ২২ হাজার সবসময় শহরে থাকেই। এতটুক শহরের মধ্যে এতো অটো মেনে নিতে পারি না। যারা বেশি নিয়েছে তাদের কমিয়ে প্রকৃত অটোচালকদের দিবো। এবং প্লেট ব্যতীত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অন্যকোনো অটো প্রবেশ করতে পারবে না।
পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি চিত্তরঞ্জন ঘাটে গাড়ি রেখে ওপাড়ে বন্দরে গিয়েছিলাম। সেখান সোনাকান্দা যাবো। সেখানে তিন জায়গার আমার অটো আটকে চাঁদা দাবি করছে। একটা অটো যদি এইটুক পথ যেতে প্রত্যেক জায়গায় ২০ টাকা করে ৬০ টাকা দেয় তাইলে এইটা কার উপরে পড়ে? নারায়ণগঞ্জের নাগরিকদের উপরে পড়ে এই ভাড়াটা। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী অর্থবছর কোন ঘাট, সিএনজি, অটো স্ট্যান্ডের টেন্ডার-ইজারা বাতিল করবো। লাইসেন্স গাড়ি বিনা পয়সায় চালাচল করবে। আমি পর্যালোচনা করে দেখেছি, এই খাত থেকে সিটি কর্পোরেশন ৫০-৬০ লাখ টাকা পায় কিন্তু চাঁদাবাজি হয় কোটি কোটি কোটি টাকার। সেটা জনগণের পকেট থেকে কাটা হয়। আমরা জনগণের পকেট কাটতে দিতে চাই না।
তিনি আরো বলেন, রাত ১২ টাও পানির সমস্যা। নারায়ণগঞ্জ পুরাতন শহর, পাইপলাইনগুলি বহু বছর আগের। এগুলি পরিবর্তনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ৩৪টা পাম্পের মধ্যে ৩২টা পরিবর্তন করে শক্তিশালী পাম্প দেওয়া হবে। যাতে মানুষ সহজে পানি পায়। এছাড়া সরকারের চিন্তাভাবনা চলছে আরও সুপেয় পানি দেয়ার জন্য মেঘনা নদী থেকে পানি আনার। যা দ্রুতই বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করছি।
সভায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রথম সারির রাজনৈতিক দলের অনেক নেতারা ফুটপাত, হকার, যানজট নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। কিছুক্ষণ আগে একটি ইসলামী দলের নেতা বলেছেন উচ্ছেদের নামে টম জেরির খেলা নাকি হয়। কয়দিন মাঠে ছিলেন? ফুটপাতের কোন হকারকে উঠিয়েছেন? একদিনও আসেন নাই। ডিসি এসপির কাছে গিয়েছেন বড় বড় কথা বলেছেন। বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।আগামী ১৩ এপ্রিল কে থাকবে কে থাকবেনা জানিনা নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি উচ্ছেদের জন্য থাকবেই থাকবে।
তিনি বলেন, যখন হকার উচ্ছেদের কথা উঠে নারায়ণগঞ্জের কিছু অপরাজনীতি আছেন ইনিয়ে বিনিয়ে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে কথা বলেন। আজকে স্পষ্ট করে বলতে হবে বিএনপির কোন নেতা হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে। যদি নাম না বলতে পারেন তাহলে ভবিষ্যতে কিন্তু সাবধান। ওই জিহবা দিয়ে বড় বড় কথা বলবেন না। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বললাম নারায়ণগঞ্জে হকারদের কাছ থেকে কোনো বিএনপি, শ্রমিকদল, হকার দল নেতারা চাঁদাবাজি করে না। চাঁদাবাজি করে কিছু সন্ত্রাসী তাদের কোন দল নেই। তাদের পায়ের তলে কোনো মাটি নেই, পদ-পদবী নেই। তারা চাঁদা তুলেন, শ্বশুরের নাম বলতে আপনারা লজ্জা পান? আমরা লজ্জা পাই না।
হকারদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, চাঁনমারি নতুন সড়কে চাঁনমারি থেকে বেড়ি বাধ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ২ থেকে ৩ ফুট করে জায়গা দিলে হাজীগঞ্জ মাজার পর্যন্ত ২ থেকে আড়াইহাজার হকার বসা যাবে। কোনো সংযোগ সড়কে হকার বসতে পারবেনা। হকার্স মার্কেট ভাঙতে হবে। শহরের মাঝখানে কোনো হকার থাকবেনা। যারা হকারদের শহরের বাইরে দিতে যেতে চাননা আবার হকার উচ্ছেদ চান আমি মনে তাদের ভেতরে সমস্যা আছে। হকার উচ্ছেদের জন্য যদি আমাদের রক্ত দিতে হয় সেটাও দিবো। বিগত দিনে হকার উচ্ছেদ নিয়ে ক্ষমতাসীন দল যে খেলা খেলেছে তা আমরা দেখতে চাইনা। আমাদের কাছে সবার আগে নারায়ণগঞ্জ। অতএব কাউকে ইঙ্গিত করে কোনো কথা বলবেন না। মাঠে আসে।
দল ক্ষমতায় আছে বলে বড় বড় কথা বলছি এমন না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আমি নিজে হকারদের উচ্ছেদ করেছি রাস্তা থেকে। আপনারা একজনও আসেন নাই। আবার আপনারা বলেন আমরা নাটক করি। আমরা নাটক করি না। আপনারা কথার নাটক করেন। চার দেয়ালের ভেতরে বড় বড় কথা বলেন মাঠে নামতে চাননা। আর কেউ মাঠে থাকুক আর না থাকুক মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা হকার উচ্ছেদে মাঠে থাকবেই থাকবে।
যানজট সম্পর্কে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের যানজটের জন্য যেমন করে অটো রিকশা দায়ী তেমনি করে শহরের মাঝখানে কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল দায়ী। বাস টার্মিনাল শহর থেকে বাইরে নিয়ে ট্রাক স্ট্যান্ড বাইরে নিয়ে গেলে শহরে যানজট থাকবে না। নিতাইগঞ্জে কোনো ট্রাক লোড আনলোড হতে পারবেনা। পঞ্চবটি স্ট্যান্ডে যেতে হবে। প্রয়োজনে ৩ থেকে ৪টা ট্রাককে লোড আনলোড করতে দেয়া হবে। রিকশার প্লেট একজন ব্যক্তিকে একটার বেশি অনুমোদন দেওয়া যাবে না। আমি সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দদের অনুরোধ করবো সবাই মিলে এই উচ্ছেদে সহযোগিতা করতে হবে।
প্রশাসক সাহেব যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেটা উনার উদ্যোগ না। উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী উনি এটা বাস্তবায়ন করছেন। সবাইকে অনুরোধ আমরা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবেন। মুখে উচ্ছেদ বলবেন পেছন থেকে উস্কানি দিবেন এমন কোনো নেতা যদি করেন আর আমরা যদি ধরতে পারি তাহলে নারায়ণগঞ্জবাসীর সামনে উম্মোচন করে দিবো আপনারা জনবিরোধী কাজ করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমরা শুনতে পেয়েছি ১৩ তারিখ হকার উচ্ছেদের সময় হকারদের সাথে অটোচালকেরা যোগ দিবেন বিশৃঙ্খলা করতে। আমি বলতে চাইনা এটা আওয়ামী লীগের আমলা না, কোনো গডফাদারের আমল না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উনি যে ঘোষণা দিয়েছেন সেটা আমরা বাস্তবায়ন করবো।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেছেন, “আমরা যাই বলি না কেন, এই ফুটপাতে হকার যারা বসে, এরা এমনি এমনি বসে না। এরা পুলিশকে টাকা দিয়ে, রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিবর্গকে টাকা দিয়েই বসে। এমনি এমনি বসে না। আমরা নারায়ণগঞ্জে হাটি। আমরা তো কথা বলি। আমরা জানি।”
তিনি বলেন, “সুতরাং ব্যাপারটা হচ্ছে যে, আমরা এদের প্রতি নির্দয় নই। কিন্তু পথের প্রথম অধিকার হচ্ছে পথিকের অর্থাৎ নাগরিকের। নাগরিক সুবিধাটা অবশ্যই আমরা প্রথম গুরুত্ব দেবো। এবং সেইজন্য এই নাগরিকের প্রয়োজনে ফুটপাতটাকে হকার মুক্ত করাটা অত্যন্ত জরুরি। আমি আর অন্য কোন আলোচনায় গেলাম না।”
তিনি আরো বলেন, “পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এইটিকে একটি শৃঙ্খলা নিয়মের মধ্যে আসতে হবে এবং আপনি নগরের জন্য নাগরিকের জন্য যেই জনবান্ধব কর্মসূচি নেবেন সকল সময় আমরা আপনার সেখানে পক্ষে রয়েছি।”
তিনি বলেন, “একটা সময় ছিল যখন নারায়ণগঞ্জে হকারদের সংখ্যা ছিল ৪৫০। পরে এই সংখ্যাটি ১৫০০, তারপরে ২০০০ এবং এরপর আরও বাড়ে। যানজট আমাদের দীর্ঘদিনের সংকট। খুব সহসাই আমরা এই সংকট থেকে মুক্তি পবো না। আমরা হকারদের তুলে দিলাম কিন্তু সংকটটা আমরা সমাধান করে ফেলতে পারবো কিনা। আমাদের দেশে করুণ বাস্তবতা হচ্ছে- যখন বন্যা হয় বা সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় হয় তখন বিভিন্ন জেলার গ্রামের মানুষগুলো, বানভাসী মানুষগুলো শহরে এসে তারা জীবিকার জন্য বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়। তাদের মূল দৃষ্টিটা থাকে ঢাকা শহর এবং পরে নারায়ণগঞ্জ।”
তিনি আরো বলেন, “এই বানভাসী মানুষগুলো তাদের জীবিকার জন্য যখন আমাদের এখানে আসে তখন দুইটি জীবিকা তাদের সামনে থাকে। এক হচ্ছে হকার আরেক হচ্ছে রিকশা চালানো। আমরা কি এই সকল বানভাসী মানুষ, যারা জীবিকার জন্য নারায়ণগঞ্জে আসে তাদের দায়িত্ব নিতে পারবো বা নেওয়া উচিত? এরা যেহেতু আমাদের দেশের মানুষ, তাদের প্রতি অবশ্যই আমাদের একটা মমত্ববোধ আছে এবং তারা আমাদের এই দেশে জীবিকার জন্য টিকে থাকবে। আমরা সেই আকাক্সক্ষা করি। এটি আমরা মনে প্রাণে চাই।”
তিনি বলেন, “কিন্তু দেশের এই অসহায় নিরন্ন মানুষের দায়িত্ব আমরা নিতে পারবো কিনা এটি হচ্ছে প্রথম প্রশ্ন। একটা সময় আমাদের এইখানে যখন নাকি এই যে হকার মার্কেটটি করা হলো, এদেরকে পুনর্বাসন দেয়া হলো। পুনর্বাসনের জন্য একটি জায়গা করা হলো। আমরা দেখলাম খুব কম সময়ের মধ্যে এই দোকানগুলো তারা ২ লাখ, ৪ লাখ, ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়ে আবারও ফুটপাতে বসলো। তারা তাদের গ্রামের ভাই-ব্রাদারদেরও নিয়ে আসলো। তারা নারায়ণগঞ্জে আবার চটি বিছিয়ে দেয়, চৌকি বিছিয়ে দেয়।”
হকার পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুনর্বাসনের বিষয়টা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু এটি একটি সেকেন্ডারি বিষয়। ব্যাপারটা হচ্ছে যে- আমরা ফুটপাত মুক্ত করার পর তা ধরে রাখতে পারবো কিনা। আমাদের বাস্তবতা বলে- সাতদিন, এক মাস পরে পাঁচজন-সাতজন বসলো, তাদের দেখে বাকিরা বসলো। আবার জমজমাট হয়ে গেল ব্যবসা। এখন এই প্রক্রিয়া থেকে স্থায়ীভাবে আসার জন্য একটা মাস্টার প্ল্যানের দরকার রয়েছে। যেই মাস্টার প্ল্যানের সাথে শুধু প্রশাসন থাকলে চলবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাটাও সবচেয়ে বেশি জরুরি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে হকার সমস্যা দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে হকার উচ্ছেদে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে হকার সংখ্যা ও দখল বাড়তে থাকে। চাষাঢ়া থেকে শুরু করে দুই নম্বর গেট, মণ্ডলপাড়া, কালীবাজার, ব্যাংক মোড় ও মাজার এলাকা পর্যন্ত ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়ে পড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের চলাচলে মারাত্মক ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জকে বাঁচাতে হলে ফুটপাত দখলমুক্ত করতেই হবে। হকারদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা না নিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অল্পসংখ্যক হকারের কারণে লাখো মানুষের ভোগান্তি মেনে নেওয়া যায় না। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা গেলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে এবং শহরে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি শহরের বাইরের দিকে নির্ধারিত বাস স্ট্যান্ড ও চক্রাকার বাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন করে প্লেট বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়ম না হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্লেট নিতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জকে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন শহরে রূপান্তর করা সম্ভব। এজন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও ডিআইটি রেল কলোনী জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেছেন, “হকার ও যানজট মুক্ত শহর সকলের কাম্য। যানজটমুক্ত শহর তৈরি করার জন্য কিছু পরিকল্পনা আমাদের অবশ্যই নিতে হবে। সে পরিকল্পনাগুলো যদি সাথে আমরা না রাখি, তাহলে শুধু অটোকে শহর থেকে বের করলেই যানজট মুক্ত হবে না। আমি বহু সময় দেখেছি আমাদের বাসগুলি দুই নম্বর গেটে যাত্রী উঠাবার জন্য দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করে এবং আস্তে আস্তে করে তারা চলে এবং যাত্রীগুলোকে উঠাবার জন্য তারা যানজটের সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, বাস তার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে প্যাসেঞ্জার উঠাবে। প্যাসেঞ্জার যাওয়ার তাগিদে অবশ্যই কাউন্টারে গিয়ে সে টিকেট নিবে বা সেখানে উঠবে। মাঝখানে রাস্তা থেকে কোন যাত্রী উঠানামা করা এটা আসলেই বৈধ নয়। এটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করলে একদিক থেকে কিছুটা যানজটমুক্ত হবে।
তিনি আরো বলেন , পাশাপাশি চাষাঢ়ার মত জায়গায় অনেকগুলি বাস আছে আমি নাম বলবো না। আমি জেলা প্রশাসকের কাছেও একবার এ কথা বলেছিলাম। বাসগুলি সেখানে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে তার প্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন্য রাস্তাটাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এগুলাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি বলেন, অটো মিশুকে আমরা যারা দূর থেকে কিছু মালামাল বা রোগী নিয়ে আসি তারা অটো নিয়েই শহরে ঢুকি। এবং সে মালবাহী অটোটাকে চেঞ্জ করে আরেকটা অটোতে উঠানামা করা অবশ্যই অনেক কষ্টকর ব্যাপার হবে। এই দূরের গাড়িগুলাকে কোথায় রাখবো? এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমি শুধু একদিকে বন্ধ করে দিলাম। আরেকদিকে তার প্রতিকার রাখলাম না। তাহলে সেটাকে লাস্টিং করা যাবে না।
তিনি আরো বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাইসেন্সের ব্যাপারেও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আসা উচিত। আপনারা যদি নিয়ন্ত্রণ করেন তাহলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অটোগুলোই শহরে এবং শহরের বাইরেও যাবে, আসবে। এজন্য অটোগুলাকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করা চাই। হকারের ব্যাপারে অতীতে আমরা বারবার দেখেছি যে হকার এখান থেকে উচ্ছেদ করা হয় কিন্তু সমাধান হয় না। আসলে আমরা আমাদের নিজের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ না দেখে জনগণের স্বার্থ দেখে হকার উচ্ছেদ করবো এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা সকলেই যদি এতে একমত থাকি। তারপর মানবিক দিক থেকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায় সেদিকে দেখতে হবে।
মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেব প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন। বারংবার যখন হকার ইস্যু নিয়ে কথা হয় তখন কিছুসংখ্যক লোক বলে রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় হকাররা ফুটপাতে বসে থাকেন। আবার যখন হকার উচ্ছেদের কথা আসে তখন আবার পুনর্বাসনের কথা আসে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে একটা কথা বলতে চাই, হকার পুনর্বাসনের কথাটাই প্রক্রিয়াটাকে বাধাগ্রস্ত করার প্রথম চেষ্টা।
বিভিন্ন জেলা থেকে নারায়ণগঞ্জে লোকজন এসেছে, একজন এসে আবার ৭ জন নিয়ে এসেছে। তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব কোনোভাবেই নগরবাসী নিবে না। এখানে যদি কোনো হকার থেকে থাকেন যারা ভোটার তাদের ক্ষেত্রে বিবেচনা, আলোচনা করা যায়। কিন্তু উচ্ছেদের পরে। তাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে যেনো উচ্ছেদ অভিযান করা না হয়। দ্বিতীয় কথা, হকার উচ্ছেদ হবে আবার কয়েকজন হকার এখানে বসবেন তা আর কোনোভাবেই করা উচিত না। সিটি করপোরেশন অনেক মোটা অঙ্কের ট্যাক্স নিচ্ছে পাশাপাশি নগরবাসী ট্যাক্সও দিচ্ছে এই ফুটপাত দিয়ে হাটার জন্য। মা-বোনদের পাশাপাশি সবাই যেনো নির্বিঘ্নে হাটাচলা করতে পারে। আর বাহিরের যেসব হকার রয়েছেন তাদের জেলায় মেয়র, প্রশাসক, ডিসি, এসপি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ রয়েছেন, তাদের দায়িত্ব তারা নিবেন। অটোরিকশা শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় সারাদেশের জন্য অভিশাপ। আমরা অটোরিকশা দৌরাত্ম্য নিয়ে চিন্তিত।
তিনি বলেন, অটোরিকশা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আমি যোগাযোগ উপ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আগে যারা প্যাডেলচালিত রিকশা ব্যবহার করতো তাদের আগে অগ্রাধিকার দিয়ে নবায়ন করবেন। অটোরিকশা চালকদের কার্ড দিলে তারা বিক্রি করে দিবেন, কার্ড নষ্ট করে দিবেন। আমি এর আগেও প্রস্তাব দিয়েছিলাম অটোরিকশা যদি দুটো কালারের করা যায় এবং তিনদিন করে শহরে চলতে এভাবে নিয়ম করা যায় তাহলে হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এখন যদি অটোরিকশার রং হলুদ করা হয় তাহলে আগামীকালই সব অটোরিকশার রং হলুদ হয়ে যাবে। সবুজ রং করলে সব অটোরিকশার রং সবুজ হয়ে যাবে। সপ্তাহে স্লট করে দিলে আর এই সমস্যা থাকবে না। তাহলে প্রতিদিনও রং পরিবর্তন করাও সম্ভব হবে না। এভাবে আপাতত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। সবশেষ নাসিক প্রশাসকের কাছে নারায়ণগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে আমার একটাই অনুরোধ, উচ্ছেদ মানেই উচ্ছেদ এখানে কোনো পুনর্বাসনের কথা উঠবে না। আগে উচ্ছেদ হবে পরে পুনর্বাসনের আলোচনা হবে যারা এখানে ভোটার আছেন, যারা নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা তাদের নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করবো
নারায়ণগঞ্জ মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক শওকত আলী বলেছেন, ফুটপাতে হকার বসার কোনো আইনগত বৈধতা নেই, তাই অবৈধভাবে যারা হকার বসছে তাদের উচ্ছেদ করতে হবে। একই বিষয় নিয়ে বারবার আলোচনা করতে হচ্ছে, যা নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা।
তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদাবাজির কারণে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান, এসব নিয়ন্ত্রণে কারা জড়িত তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। হকার উচ্ছেদ অভিযানে রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি মাঠে নামা উচিত নয়; এটি প্রশাসনের কাজ, রাজনৈতিক দলগুলো শুধু সহযোগিতা করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তা দখল এবং অটোরিকশার অতিরিক্ত সংখ্যা যানজটের প্রধান কারণ। এসব সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। লাইসেন্সের বাইরে বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। প্রশাসনের বর্তমান উদ্যোগকে স্বাগত জানাই, তবে শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান।