এনসিপি-জামায়াতের হাত ধরে ওসমান দোসর হাতেমের উত্থান
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
এনসিপি-জামায়াতের হাত ধরে ওসমান দোসর হাতেমের উত্থান
ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ হাতেমের সাথে কুখ্যাত ওসমান পরিবারের সখ্যতা নতুন নয়। পুরো আওয়ামী লীগের গোটা শাসনামলে সেলিম ওসমান, শামীম ওসমানসহ গোটা ওসমান পরিবারের সাথে দহরম-মহরম নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে খোলা বইয়ের মতো। ওসমানদের সময় থেকেই ফতুল্লা পঞ্চবটি বিসিক এলাকায় ঝুট নেটওয়ার্কের এক শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলে হাতেম। ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিদাল নিলেও রঙ বদলেছে হাতেম, আর ৫ আগস্টের পর হাতেমকে সেই সুযোগ কারা দিয়েছে তাও সামনে আসতে শুরু করেছে। ২৪ আগস্ট সেলিম ওসমান তার পদত্যাগপত্রে হাতেমকে বিকেএমইএর সভাপতি করতে নসিহত করে যান। আর সেলিম ওসমানের সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন এনসিপি-জামায়াতের বেশ কিছু নেতা। আর তাই আগের চেয়েও আরও শক্তিশালী হাতেম। কেমন শক্তিশালী তা দেখা গেল ফতুল্লায় এক ইফতার পার্টিতে। হাতেমের ঈশারায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আলআমিন দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ থাকলেন, পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার হলেন। হাতেম যেন ফতুল্লা বিসিকের এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। ৫ আগস্ট এনসিপি, জামায়াত ইসলামী কিছু নেতার আশকারায় হাতেম আজ তাদের কর্তা বনে গেছেন। এমপি নাজেহাল হলেও তাদের মুখে ‘টু’ শব্দ নেই। ৫ আগস্ট পরবর্তীতে হাতেমকে সুরক্ষা দিয়ে আজকের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরিতে তারাই মূল ভূমিকা পালন করেছেন।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৩ আগষ্ট আন্দোলনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বৈঠক করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে বিকেএমইএ'র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উপস্থিত হয়ে তিনি তার বক্তব্যে ছাত্র আন্দোলনকে তান্ডব আখ্যা দিয়ে আন্দোলনকারীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন এমনকি সর্বদা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেও গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্নে নিজের চরিত্র পাল্টে ফেলেন মোহাম্মদ হাতেম। প্রথমেই তার ওই রক্ত মাখা হাতে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক এবং বর্তমানে জাতীয় নাগরিক কমিটির সক্রিয় নেতা সারজিস আলম ও আক্তার হোসেনের হাতে অনুদান সরূপ ৫০ লাখ টাকার চেক তুলে দিয়ে ‘দোসর’ আখ্যা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে চাইলে ও সেই ৫০ লাখ টাকার চেককে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা বিতর্ক শুরু হয়। যা নিয়ে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেপথ্য অন্যতম ভূমিকা রাখা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাজরিস ও আক্তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যে করে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপিকে প্রথম দফায় ৫০ লাখসহ কয়েক দফায় মোটা অংকের টাকা অনুদান দিয়ে কোটা আন্দোলনের বিরোধীতা করে ও শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অনুদানে ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের মধ্যস্ততায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে নাম লিখিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেন ‘দোসর’ হাতেম। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে অবস্থান পোক্ত করতে ২৫ আগষ্ট সেলিম ওসমানের পদত্যাগপত্রের প্রেসক্রিপশনে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ'র সভাপতি পদে আদিষ্ট হয়ে ফের ওসমানদের সেই রক্ত চক্ষু ভয় দেখিয়ে বিসিকের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের ব্লাকমেইলিং করে হাতেম নিজে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সকল গার্মেন্টস-ফাক্টরীর ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন। এমনকি ফতুল্লাসহ জেলার প্রভাবশালী বিএনপি নেতাকর্মীদের ডেকে ঝুট সেক্টর বন্টন করেন। প্রথমেই তার বড় ছেলে হাসিন আরমান (অয়ন) এর মাধ্যমে থানা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে একাধিক গার্মেন্টস-ফ্যাক্টরির ঝুট সেক্টর বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে এনায়েতনগর ইউনিয়ন বিএনপিসহ জেলা যুবদলের নেতারা ফুঁসে উঠলে তাদের কানে নানা বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে বিসিকে সৃষ্টি করেন একটি সংঘর্ষ। পরবর্তীতে দুই গ্রুপকে একত্রিত করে বন্টন করে দেন গার্মেন্টস-ফ্যাক্টরী। এমনভাবে গত দেড় বছরে বিসিকে বিএনপি একাধিক গ্রুপের হাতে গার্মেন্টস-ফাক্টরীর ঝুট ব্যবসা বন্টন করে দেন হাতেম। এদিকে জুলাই আন্দোলনের বড় চাইতে বড় শত্রু হিসেবে আখ্যা পাওয়া মোহাম্মদ হাতেম এটা জানা স্বস্তে¡ ও মহানগর জামায়াতের আমীর আব্দুল জব্বার, জামায়াত কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ নেতা মাওলানা মঈনুদ্দিন, ইঞ্জিনিয়ার মানোয়ার হোসাইনকে একাধিকবার ওসমান দোসর হাতেমের সঙ্গে নানা আলাপচারিতায়সহ চাষাড়ায় বিকেএমই‘এ ভবনে ৫ আগষ্টের পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জের জামায়াতের এই তিন পরিচিত মুখের নেতাকে দফায় দফায় লক্ষ্য করা গেছে। এনসিপি ও জামায়াতের হাত ধরেই ওসমান দোসর হাতেমের নবউত্থান। এনসিপি-জামায়াতকে অনুদান দিয়েই ‘দোসর’ আখ্যা গুটিয়ে শক্ত অবস্থানে এখন মোহাম্মদ হাতেম। এখন ‘দোসর’ বললেই ফুঁসে উঠেন তিনি। এমপি দুই ঘন্টা আটকে রাখতে পারেন।
এদিকে এমনই এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে নারায়ণগঞ্জবাসী বিসিক এলাকায় জামায়াতের ইফতার মাহফিলে সেলিম ওসমানের সহযোগী ফ্যাসিস্টের দোসর বলাকে কেন্দ্র করে বিকেএমইএ'র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ‘দোসর’ বলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনকে দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ পাওয়া যায় হাতেম ও তার গুন্ডা বাহিনীসহ বিএনপির কিছু সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে। গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় জামায়াত ইসলামীর পেশাজীবী ফোরামের ইফতার মাহফিলে এ ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া সূত্র জানিয়েছে, এমপি আল আমিন যখন প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন, তখন একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ দুই নেতা মহানগর আমির আব্দুল জব্বার ও নেতা মাইনুদ্দিনকে হাতেমের সঙ্গে অন্য ভবনে বৈঠকে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছে অ্যাডভোটেক আলআমিন। এমপি যখন অবরুদ্ধ দুই ঘন্টা যাবৎ তখন নারায়ণগঞ্জ জামায়াতের এই দুই নেতার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি এখন এলাকাজুড়ে ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়েছে। অনেকে বলছেন, ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের কিছু বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি জামায়াত নেতাদের ম্যানেজ করেই হাতেম বিসিক এলাকায় ওসমানদের আমলের মতোই দাপট ধরে রেখেছেন। তাই জামায়াত নেতাদের এমন ভূমিকা নানা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। জামায়াতের ফোরাম নেতা আবু সুফিয়ানও হাতেমের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত। যাকে ঘিরে আন্দোলনে রক্ত মাখা হাতেমের হাতে এনসিপি-জামায়াত নেতাদের হাতের সখ্যতা। এর আগে ও আল-আমিন একাধিকবার মোহাম্মদ হাতেমকে ঘিরে নানা বক্তব্যে দিয়েছেন তাকে জুলাই আন্দোলনকারীদের প্রধান শত্রু হিসেবে ও আখ্যা দিয়েছিলেন। তা ছাড়া সর্বশেষ তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের জিয়াউর রহমান জিয়া কলেজ থেকে হাতেমকে ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে বেড় করে দিয়ে বিএনপি-যুবদলের একাধিক নেতাকর্মীদের চাপের মুখে পরে ছিলেন সেই ছাত্রদল নেতা সর্বশেষ নির্যাতনের শিকার হয়ে হাতেমের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন সেই ছাত্রদল নেতা। যাকে ঘিরে বললেই চলে সেলিম ওসমানের হাতেমকে ‘দোসর’ বলা বারণ।
উল্লেখ্য, ওসমানদের দোসর হিসেবে গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ২৫ আগষ্ট সেলিম ওসমানের পদত্যাগপত্রের প্রেসক্রিপশনে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ'র সভাপতি পদ দখল নেওয়া ঝুট ব্যবসায়ী হাতেম। তিনি সেলিম ওসমানের স্বাক্ষরে সভাপতির পদে আদিষ্ট হওয়ার চিঠিসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির বক্তব্যের (ভিডিও) বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে। এর আগে ওসমানদের হয়ে গত ১৬ বছর হাতেম ব্যবসায়ীদের উপর নানাভাবে শোষন, অত্যাচার ও খবরদারি করেছে। ওসমানদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেননি। ওসমানদের বিপক্ষে কোন ব্যবসায়ী নুন্যতম প্রতিবাদ করলে কিংবা তাদের কথার অবাধ্য হলে ওসমানদের দোসর হিসেবে কুখ্যাত ব্যক্তিদের দিয়ে ওই মালিকে ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করা হতো। আবার এই হাতেমকে দিয়েই সেই অসন্তোষ মিটমাট করার কথা বলে ব্যবসায়ীদের সাথে দেনদরবার করা হতো বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। হাতেমের মাধ্যমে ওসমানদের এই চাঁদাবাজি, ফ্যাক্টরিতে অসন্তোষ তৈরিতে ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। যার ফলে কেউই তখন ওসমানদের এই সিন্ডিকেটের বিপক্ষে অবস্থান নিতেননা। ৫ আগষ্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর ২৫ আগস্ট অসুস্থতার কথা বলে পদত্যাগপত্র পাঠান সেলিম ওসমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওসমানদের ছত্রছায়ায় মোহাম্মদ হাতেম বিসিক এলাকার বহু ব্যবসায়ীকে ব্যবসা ছেড়ে যেতে বাধ্য করে। একদিকে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, আরেকদিকে জমি ব্যবসায় রমরমা সিন্ডিকেট গড়ে তোলে হাতেম। ওসমান পরিবারের প্রত্যক্ষ ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন হাতেম। একদিকে সেলিম ওসমান, শামীম ওসমান এবং অয়ন ওসমানের নিয়ন্ত্রিত বাহিনীকে ঝুট বিতরণ করতেন, অপরদিকে আজমেরী ওসমানের সাথে সখ্যতা রেখে তার ক্যাডারবাহিনীর মাধ্যমেও ফ্যাক্টরির ঝুট নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে শুধু ঝুট নয়, বিসিক এলাকায় বিচার- শালিশের নামে ব্যবসায়ীদের উপর নানা অত্যাচারের কথা এখন সেখানকার মানুষের মুখে মুখে। বিসিক এলাকার ওসমানদের হয়ে ব্যবসায়ীদের উপর এমন কোন খড়গ চালানো বাকি রাখতেননা হাতেম। ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ বিসিক এলাকায় ওসমাদের সময় নির্বাচনে ইচ্ছুক ব্যবসায়ীদের নির্যাতনের জন্য টর্চার সেলও করা হয়েছিল। ঝুট ব্যবসায়ী হাতেমের অত্যন্ত ঘনিষ্ট আরেকটি সংগঠনের ওই ব্যক্তির মাধ্যমেই ওই টর্চার সেলটি ব্যবহৃত হতো। এর বাহিরে ও নানাভাবে বিসিকে একক আধিপত্য ছিলো হাতেমের। পরবর্তীতে পটপরিবর্তনের পর এনসিপি-জামায়াত-বিএনপি নেতাদের সম্বনয়ে বর্তমানে ফের দখল-নিয়ন্ত্রণের সেই শক্ত অবস্থানে মোহাম্মদ হাতেম।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপির এমপি আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, ‘আমি জামায়াতের আমন্ত্রণে সেই ইফতার মাহফিলে গিয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না যে সেখানে হাতেম থাকবে। তাকে দেখে আমি স্টেজে বসতে অস্বীকৃতি জানাই। আমি বলেছি, ফ্যাসিস্টের দোসরের পাশে আমি বসতে পারবো না। এই কথা বলার পরেই সে বেরিয়ে যায় এবং তার লোকজনকে ডেকে এনে আমাকে দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। আমি ডিসি এসপিকে জানানোর পরে তারা ফোর্স পাঠায়। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানাই। এখনো কোন মামলা বা অভিযোগ আমরা কিছুই এখনো করিনি কিন্তু যারা আহত হয়েছে তারা যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে।’


