নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মতামত দেওয়ার পর এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এদিকে ফতুল্লা থানারই সহযোগী ইউনিয়ন কাশীপুরকে মাইনাস করেই সুবিধা নিতে যাচ্ছে ফতুল্লার বাকি ৩টি ইউনিয়ন। যা নিয়ে কাশীপুরবাসীর মাঝে ও বাড়ছে ক্ষোভ।
দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পাঞ্চলসমৃদ্ধ এসব এলাকার মানুষ সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে নাগরিক সেবার মান বাড়বে এমন প্রত্যাশা করছেন অনেকে। তবে বাড়তি কর, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও সেবার বৈষম্য নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। তা ছাড়া কাশীপুরের বাসিন্দারা বঞ্চিত কেন তা নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। তা ছাড়া কাশীপুর চরের একাংশ ব্যাত্বিত পুরোটাই শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এদিকে সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চল ও সদরের আংশিক অংশ এবং বন্দর উপজেলার কদমরসূল অংশ নিয়ে ২০১১ সালে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। বর্তমানে সিটি করপোরেশনে মোট ২৭টি ওয়ার্ড রয়েছে। নতুন করে তিন ইউনিয়ন যুক্ত হলে নাসিকের ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এদিকে শহরের লাগোয়া ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়ন বর্তমানে জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি। শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা ও শ্রমজীবী মানুষের বসতি মিলিয়ে ইউনিয়ন তিনটির অনেক অংশ কার্যত নগর এলাকার সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ মনে করেন, সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পরিকল্পিতভাবে পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার কাঠামোর পরিবর্তন কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় শিল্পকারখানা ও আবাসিক স্থাপনা পাশাপাশি গড়ে উঠেছে।
কোথাও সরু সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, কোথাও আবার শিল্পকারখানার বর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য একই জায়গায় জমা হচ্ছে। কুতুবপুরের চিত্রও অনেকটা একই। ঘনবসতির কারণে সড়ক ও ড্রেনেজের ওপর চাপ বাড়ছে। এনায়েতনগরের বিভিন্ন এলাকাতেও দ্রুত বাড়ছে আবাসিক ও শিল্প স্থাপনা। ফলে ইউনিয়ন তিনটির অনেক এলাকাতেই নগর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
এদিকে গত রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ মতামত জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সীমানা পরিবর্তন (সম্প্রসারণ এবং সংকোচন) বিধিমালা, ২০১৩ অনুযায়ী নাসিকের সীমানা বর্ধিতকরণের বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এর আলোকে গত ২৭ জুলাই ও ১১ আগস্ট গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিদর্শন কমিটি গঠন করা হয়। পরিদর্শন কমিটি সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে ড্রোন ফুটেজসহ প্রতিবেদন দাখিল করে। গণশুনানি ও পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিধিমালার ৩ নম্বর বিধি অনুযায়ী ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অংশ নাসিকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা, পেশা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো এবং জনমত বিবেচনায় এসব এলাকা সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির উপযোগী। তবে সর্বশেষ প্রতিবেদনে কাশীপুর ইউনিয়নের কোনো অংশকে নাসিকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়নি। অথচ এর আগে প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সম্পূর্ণ অংশ সিটি করপোরেশনে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে কাশীপুরকেই বঞ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে আলোচনা উঠছে, সিটি করপোরেশনের সীমানা বাড়লেই সব নাগরিক সমস্যার সমাধান হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান এলাকাতেও জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখল ও সড়কের বেহাল দশা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন এলাকা যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান সেবা কাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে নাগরিকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ। সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ বিভিন্ন ধরনের কর ও ফি আরোপের সুযোগ তৈরি হবে। ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের করব্যবস্থার পার্থক্য নিয়ে ইতিমধ্যে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, কর দিতে আপত্তি নেই।
তবে এর বিনিময়ে দৃশ্যমান ও নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তিন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের বড় প্রত্যাশা উন্নত নাগরিক সেবা। একই সঙ্গে তাঁরা চান, সীমানা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হোক। কারণ একটি ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়া শুধু প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের করব্যবস্থা, জীবনযাত্রা, ভূমি ব্যবহার, ভবন নির্মাণ, সড়ক ও নাগরিক সেবার ভবিষ্যৎ।
নারায়ণগঞ্জের দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগরকে আর প্রচলিত গ্রামীণ ইউনিয়ন হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা আছে, সেটিও এখন বিবেচনার বিষয়। এসব এলাকায় নগর জীবনের চাপ ইতিমধ্যে স্পষ্ট। অপরিকল্পিত আবাসন, শিল্পকারখানা, যানবাহনের চাপ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় অবকাঠামো প্রতিনিয়ত চাপে পড়ছে। তবে সিটি করপোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণের সুফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা জরুরি। কোন এলাকায় আবাসিক স্থাপনা হবে, কোথায় শিল্পকারখানা থাকবে, কোথায় খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ করা হবে, কীভাবে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয় আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে নারায়ণগঞ্জের নগরায়ণের পরিধি নিঃসন্দেহে বাড়বে। বর্তমানে কাশীপুরকে বাদ রেখেই ফতুল্লা যাচ্ছে সিটিতে।
এদিকে সূত্র জানিয়েছেন, সদর উপজেলা টিকিয়ে রাখতেই কাশীপুর, আলীটেক, গোগনগর, বক্তাবলীকে সিটির আওতায় আনা হয়নি। এর থেকে একটি ইউনিয়ন সিটিতে যুক্ত হলেই ভাঙবে উপজেলা পরিষদ।