তালিকা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বিতর্কিতদের
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
তালিকা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বিতর্কিতদের
দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে এবারের শুদ্ধি অভিযানের ‘লাইন অব অ্যাকশন’ আরও কঠোর। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বার্তা, অপরাধের ক্ষেত্রে পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিবেচ্য বিষয় হবে না। এরই মধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। সামনে আরও কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী ও দলীয় নেতার কর্মকাণ্ডও নজরদারিতে রয়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর রাজধানীর লাগোয়া জেলা নারায়ণগঞ্জে পালাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যবসা-বানিজ্যেসহ সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের পাহাড়া দিচ্ছেন বিএনপি নেতারাই। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের সকল ফেলে যাওয়া কুকর্মে জড়িয়েছে বিএনপি। যাকে ঘিরে বর্তমানে বিতর্কে বিতর্কিত বিএনপি। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই নিজেদের বিতর্ক গুছিয়ে ফেলতে ইতিমধ্যে পদ-পদবী না দেখেই দলের নেতাদের ক্লিন রাখতে পরতে যাচ্ছে ‘শুদ্ধি অভিযান’। ইতিমধ্যে বিতর্কদের তালিকা তৈরি শুরু হচ্ছে। যাকে কেন্দ্র করে বিএনপি বিতর্কিত নেতারা বর্তমানে সতর্কে রয়েছে।
কিন্তু বহিষ্কারের তালিকা দীর্ঘ হলেও নারায়ণগঞ্জে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে নানা অপকর্মে জড়ানোর অভিযোগ সামনে আসছে। সর্বশেষ চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সালকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে সিদ্ধিরগঞ্জে পদ্মা অয়েল পিএলসির গোদনাইল ডিপোর কর্মীদের কাছে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে করা মামলায় ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট ফয়সাল অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে ডিপোর জেট-এ-১ পয়েন্টে প্রবেশ করে ওই অর্থ দাবি করেন। ফয়সালের বহিষ্কারই প্রথম নয়। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন। গত ৯ এপ্রিল ফতুল্লার চাঁদনী হাউজিং এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনার পর ফতুল্লা থানা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান মাসুদকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল।
এরপর মে মাসে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধিরগঞ্জের নাসিক ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও জনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা দলীয় সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়। জুনে এনায়েতনগর ইউনিয়ন যুবদলের চার নেতাকর্মী মো. মামুন, মো. কাউছার, শ্রী নিতাই ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিএনপির এক নেতাকে মারধরের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। একই মাসে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল।
চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা তখন দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এর আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছিল পুলিশ। রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কোহিনূর আলমও বহিষ্কারের তালিকায় যুক্ত হন। বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জুনের শেষ দিকে জেলা বিএনপি তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়। আগস্টে সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ এবং উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক ও পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিলকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল আমিন ইকবালকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় কৃষক দল। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে তার বিরুদ্ধে নীতি, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়। সেপ্টেম্বরে সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শুক্কুর আলীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে গত ৫ আগষ্টের পর ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী, শ্রমিক দল নেতা আসলাম ও তোফা, যুবদল নেতা খাইরুল ইসলাম সজীব এরা সকলেই বহিস্কারের পাশাপাশি গ্রেফতারের আওতায় ও এসেছিলেন।
সর্বশেষ কারাগারে রয়েছেন মহানগর কৃষকদলের সদস্য সচিব ফয়সাল। এমনইভাবে পদ-পদবীকে ফ্যাক্টর না রেখেই ইতিমধ্যে কঠোর হয়েছে বিএনপি। সেই হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে তালিকা। যাকে ঘিরে সতর্কে বিএনপি। তা ছাড়া দলীয় শৃঙ্খলা সুরক্ষার এই অভিযানে ‘ঝুঁকিতে’ আছেন আরও কয়েকজন বড় পদের দলীয় নেতা। তাদের বিষয়টিও তদন্তাধীন। দলের হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী কাউকেই কোনো ধরনের সাংগঠনিক সুরক্ষা দেওয়া হবে না। নেতা যত বড়ই হোক, সাংগঠনিক শাস্তির আওতায় আসতেই হবে।
তাদের মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি নেতাকে বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তথ্য বলছে, শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বিএনপির জন্য নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। সরকার গঠনের পরও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। শুধু সাংগঠনিক শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না ব্যবস্থা। অভিযোগ গুরুতর হলে কোথাও কোথাও নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।


