নেপথ্যে কলকাঠি নাড়েন সেই ‘জালাল মামা’
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
নেপথ্যে কলকাঠি নাড়েন সেই ‘জালাল মামা’
ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের স্বঘোষিত ‘কর্তা’ হিসেবে পরিচিত নাম জালাল মামা। রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত বা পদ না থাকলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গডফাদার শামীম ওসমান নাকি তার মামা শশুর জালাল মামা। সেই ট্যাগ লাগিয়েই শামীম ওসমানের অপকর্মের টাকার তোলার পাশাপাশি নিজে নিতেন মোটা অংকের পার্সেন্টিজ। সব মিলেই অপেছন থেকে অপকর্মের বাদশা ছিলেন তিনি। সেই হিসেবেই ইশারায় নিয়ন্ত্রণ হতো সেই দুটি থানার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সকল অপকর্ম।
তা ছাড়া এই দুটি থানার সকল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবং উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন এবং শামীম ওসমানের আনুকুল্য পেতে দরকার হতো এই জালাল মামার সমর্থন। নেতাকর্মীরা সব সময় নেক নজর পেতে নিয়মিত কুকর্মের ভাগের বান্ডিল নিয়ে হাজিরা দিতেন জালাল মামার ব্যক্তিগত অফিসে। দিয়ে আসতেন অবৈধ আয়ের একটি অংশ মানে ‘নজরানা’। তা ছাড়া শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছেও তিনি পছন্দের জালাল মামা।
দিয়ে আসতে অবৈধ আয়ের একটি অংশ মানে নজরানা। কেউ কোন মাসে ঠিক মত নজরানা না দিলেই তার সমস্যা তৈরী হতো। শুধু আওয়ামলীগ নয়, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছেও তিনি পছন্দের জালাল মামা ছিলেন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো শামীম ওসমান এমপি নির্বাচিত হলে জালাল মামার পোয়া বারো হয়ে উঠে পুরো ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায়। ওই সময়ে প্রভাবশালী ‘মামা’ বনে যান তিনি সিদ্বিরগঞ্জ এলাকায়। শামীম ওসমান এমপি হওয়ার আগে জালাল উদ্দিন ‘জালাল মামা’ খেতাবটা তার শরীরে তেমন একটা লাগেনি।
তা ছাড়া শামীম ওসমানের মামা শ্বশুর হওয়ার কারণে জালাল মামা ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় আওয়ামীলীগের নেতাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ সময় নুর হোসনের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন জালাল মামা। নুর হোসেনও জালাল মামাকে সমীহ করতেন শামীম ওসমানের মামা শ্বশুর হওয়ার কারণে। আলোচিত সাতখুনের পর নুর হোসেন ও তার বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার পর নুর হোসেনের এফ প্রিমিয়াম (ঢাকা মেট্রো-২৯-৮৮-৬২) নামে মাইক্রোবাসটি জালাল মামার গ্লাস ফ্যাক্টরীর ভেতর থেকে উদ্ধার করে আইনশৃংখলা বাহিনী। এলাকায় আলোচনা আছে, নুর হোসেনের পতনে সবচেয়ে বেশী লাভবান হয়েছেন জালাল মামা।
পরবর্তীতে স্বঘোষিত ‘ডন’ বনে গিয়েছিলেন তিনি। ফলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে সহযোগি সংগঠনের সকল নেতারাই জালাল মামার দ্বারস্থ হয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জে ঘটন-অঘটন সবই জালাল মামার নলেজে থাকতে হবে। কারণ সব কিছু থেকে তার হিস্যা (ভাগ) চাই। তা ছাড়া বিভিন্নভাবে নানা কৌশলে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জবাসীকে বুঝিয়ে দিতেন তিনিই সিদ্ধিরগঞ্জে ‘কর্তা’। শামীম ওসমানের পরেই তার অবস্থান। তিনি যা বলবেন তাই হবে। এতে করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতারা ছাড়াও শামীম ওসমানের অনুসারী আওয়ামীলীগ সমর্থিত নাসিক কাউন্সিলরদের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনি। তাদেরকে তার নিয়ন্ত্রনে থাকতে বাধ্য করেন।
বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মাদক ব্যবসায়ি ও পরিবহন চাঁদাবাজ ভাগিনা দেলোয়ার ও নুর হোসেনের ছোট ভাই বালু সন্ত্রাসী জজ মিয়াকে সরাসরি শেল্টার দিয়েছেন জালাল মামা। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিতেন মাসে মাসে। এছাড়াও কারাবন্দি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী নুর হোসেনের মেসেজে তার ভাই মিয়া মোহাম্মদ নুরুউদ্দিনকে বিএনপি থেকে আওয়ামীলীগে ভিড়িয়েছেন জালাল মামা।
এছাড়া শিমরাইলের নাজমুলের কাছ থেকেও সুবিধা নিয়েছেন নিয়মিত। আবার চোরাই তেল ব্যবসা থেকে সুবিধা নিতে সাবেক কাউন্সিলর সিরাজ মন্ডলকে শামীম ওসমানের কাছে ভিড়িয়ে দেন জালাল মামা। জালাল মামার কারণেই নাসিক ৬নং ওয়ার্ডের পরিবেশ অশান্ত ছিল আওয়ামী সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত। এই ওয়ার্ডটিকে জালাল মামা নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রন করেছেন। আর সুবিধা নিয়েছেন। এসব কথা ওই ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। কাশীপুরের সাইফুল্লাহ বাদল, বক্তাবলীর শওকত আলী, এনায়েতনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান নিয়মিত জালাল মামার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তাদের চেয়ারম্যান বানাতে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে জালাল মামা।
এমন কথা স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মুখে মুখে ছিল। মোটকথা ফতুল্লায় ও সিদ্ধিরগঞ্জে শামীম ওসমানের অবর্তমানে স্বঘোষিত ‘কর্তা’ বনে গিয়েছিলেন জালাল মামা। যদিও প্রকাশ্যে শামীম ওসমানের সামনে জালাল মামার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলার সাহস করতেন না। মজার বিষয় হলো সিদ্ধিরগঞ্জে শামীম ওসমানের কোন অনুষ্ঠানে জালাল মামাকে খুব একটা দেখা না গেলেও শামীম ওসমানের সহধর্মীনি লিপি ওসমানের সকল প্রোগ্রামে জালার মামার সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে শামীম ওসমানের অনুসারী নেতাকর্মীরা সব কিছুতে জালাল মামার অযাচিত হস্তক্ষেপ ও সুবিধাভোগি কর্মকান্ড বন্ধে এমপি শামীম ওসমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
ফলে কেউ জালাল মামার অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করেনি। যাকে ঘিরে ওসমান পরিবারের সুবাধে পার্সেন্টিজ ব্যবসা চালিয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক বনেছেন এই ‘জালাল মামা’। ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে সব কিছুর সাথেই ছিল জালাল মামার নাম। স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনীতি থেকে শুরু করে আদমজী ইপিজেড, বিসিক, বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য, মাদক ব্যবসীদের শেল্টার, বালু ও পাথর ব্যবসা থেকে সুবিধা, পরিবহনের চাঁদাবাজির সুবিধাসহ অনেক কিছুর সাথে জড়িত ছিলেন জালাল মামা। এর পাশাপাশি শামীম ওসমানের তোলা উঠিয়ে তার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা মাসে নিজের নামে উঠাতেন পার্সেন্টিজ। বর্তমানে দুর্ধর্ষ এই জালাল মামা দেশেই বিলাসী জীবন পার করছেন। প্রশাসনের নজরের আড়ালেই। এমনকি তার সঙ্গে বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীদের যোগাযোগ রয়েছে ও বলেও গোপনসূত্র জানিয়েছে।


