নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলামের কমিটি নিয়ে কওমী অঙ্গনের আলেম সমাজের মাঝে দুই পক্ষের কয়েক বছর যাবত বিরোধ চলে আসছে স্থানীয় হেফাজতের কমিটি নিয়ে। এই বিরোধ সমাধান না হয়েও আরো বেড়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি নতুন কমিটি ঘোষনা নিয়ে তা এখন সর্বত্রে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।
দুই পক্ষের মাঝে জেলা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সদ্য আহ্বায়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের নেতৃত্বে রয়েছে একটি পক্ষ আরেক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর নারায়ণগঞ্জ ডিআইটি মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল। নারায়ণগঞ্জ জেলা মহানগর হেফাজতে ইসলামের কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের বিভক্তি অবস্থান নিয়ে আলেম সমাজ সহ সর্বমহলে ব্যপক সমালোচনা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে তেমন ভাবে তাদের মাঝে এই বিরোধ সমাধানের তেমন নাই বলে জানান স্থানীয় হেফাজত নেতারা। হেফাজত নেতৃবৃন্দের বিভক্তি এই চলতে থাকলে মানুষ তাদের থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। যা নিয়ে এখন আলোচনাও চলছে।
তথ্যমতে, ‘হেফাজতে ইসলাম’ অর্থ ইসলাম ধর্মের সুরক্ষা বা রক্ষণাবেক্ষণ। বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত সংগঠন। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে বাংলাদেশে ইসলাম ও নবী অবমাননাকারীদের বিচারের দাবিতে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বিক্ষোভ ও গণসমাবেশের ডাক দেয়। যা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আহ্বানে ও নেতৃত্বে আয়োজিত হয়। সেই সমাবেশ থেকে হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটি ব্যপক পরিচিত লাভ করে। তখন সংগঠনটির ডাকে সর্বস্তরের মানুষ ঝাপিয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমানে সংগঠনের স্থানীয় নেতা কর্মীরা নিজেরাই দ্বন্ধে জরিয়ে পড়ায় সংগঠনটির সমালোচনা সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এতে করে মানুষও তাদের থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এমনকি মানুষ আলেম সমাঝের এই সংগঠন নিয়ে বিব্রত।
অথচ ইসলাম ধর্মে নিজেদের মধ্যে বিরোধ, দলাদলি বা বিভেদ সৃষ্টি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুরআন এবং হাদিসে মুসলমানদের সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং পারস্পরিক বিরোধ পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। "তোমরা আল্লাহর রজ্জু (কুরআন ও ইসলাম) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১০৩)
এদিকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলাস সংগঠনের তার বিপরী চিত্র ফুটে উঠেছে বিগত কয়েক বছর যাবত। হেফাজতে ইসলামের কমিটি ঘোষনা হওয়ার পর এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে পাল্টা কমিটি ঘোষনা করে নিজেদের বিরোধ প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে। মানুষের মাঝে বলাবলি হচ্ছে তারা নিজেরাই ওয়াজে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানান। কিন্তু নিজেরাই বিরোধ, দলাদলি তৈরী রয়েছেন।
রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সরাসরি পরিচয় না থাকলেও দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের কার্যক্রম গত কয়েক বছর যাবত অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যকার বিরোধ ও বিভক্তিকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেই প্রায় দুই বছর পর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন কমিটিতেও তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে নাই।
জানা যায়, ২০২৬ সনের (২৬ আগস্ট) নগরীর ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদে এক সভার মাধ্যমে জেলা ও মহানগরের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ।সদ্য ঘোষিত জেলা কমিটিতে ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদের খতিব ও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে সভাপতি করা হয়েছে।
তিনি এর আগেও জেলা হেফাজতের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া আমলাপাড়া মাদরাসার মাওলানা আব্দুল কাদেরকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং মাদানীনগর মাদরাসার মুফতি বশিরউল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান, প্রচার সম্পাদক মুফতি শেখ শিব্বিরের নাম ঘোষণা করা হয়।
একই দিনে মহানগর কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে মুফতি জাকির হোসেন কাসেমীকে। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন দেওভোগ মাদরাসার মাওলানা আব্দুর রহমানকে। তবে নতুন কমিটিকে প্রত্যাখান করে পাল্টা কমিটি ঘোষনা করেন মাওলনা ফেরদাউসুর রহমান। তারা হেফাজতের নতুন কমিটিকে মানেন বলে ঘোষনা দেন এক সভায়।
অপরদিকে এর আগে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর চাষাঢ়ার বাগে জান্নাত জামে মসজিদে প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতের কমিটি ঘোষণা করেছিলেন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। ওই সম্মেলনে মাওলানা আব্দুল আউয়ালসহ নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের বড় একটি অংশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি তারা তখন ওই কমিটিকে প্রত্যাখান করেন। যা নিয়ে বিরোধের শেষ ছিল না। এখনো সেই বিরোধ চলমান রয়েছে।
ওই কমিটিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে জেলা সভাপতি এবং খেলাফত মজলিসের নেতা এবিএম সিরাজুল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। মহানগর কমিটিতে মুফতি হারুনুর রশিদকে সভাপতি এবং মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পরই এ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া এবিএম সিরাজুল মামুন দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং ঘোষিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হেফাজতের ভেতরের এই বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসে। সংগঠনের একাংশ ফেরদাউসুর রহমানকে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরোধিতা করে আসছে। ফলে নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজানো হলেও নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের দীর্ঘদিনের বিভক্তি কতটা দূর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।