হেফাজতের দ্বন্দ্বের অবসান কবে ?
২০২৪ সালের (৫ আগস্ট) পরবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে বিরোধ লক্ষ্য করা গেলে ও সেই বিরোধ নতুন কমিটিতে ও মিটেনি। এদিকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সরাসরি পরিচয় না থাকলেও দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রভাব এখান আর নেই। নানা বিষয়ে পটপরিবর্তনের পরপই আলোচনায় চলে আসেন নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামী।
তারা বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। বিপরীতে বিভক্তি কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সমালোচনা কাটাতে ব্যর্থ হেফাজত। ইতিমধ্যে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি কমিটি ঘোষণার ঘটনায় সংগঠনটির ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধ’ ফের প্রকাশ্যে এসেছে। একই দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি কমিটি ঘোষণার পর কোন কমিটি সাংগঠনিকভাবে বৈধ, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে তিনি জেলা হেফাজতের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। আমলাপাড়া মাদরাসার মাওলানা আব্দুল কাদেরকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং মাদানীনগর মাদরাসার মুফতি বশিরউল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান (সোনারগাঁ), অর্থ সম্পাদক মাওলানা খোরশেদ আলম কাসেমী এবং প্রচার সম্পাদক মুফতি শেখ শিব্বিরের নাম ঘোষণা করা হয়।
মহানগর কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে মুফতি জাকির হোসেন কাসেমীকে। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন দেওভোগ মাদরাসার মাওলানা আব্দুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি মামুনুর রশীদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন মাওলানা মাহমুদ ইবনে আউয়াল।
এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম ব্লগার আহম্মেদ রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যার ঘটনায় তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া গোল চত্বরকে ‘রাজীব চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চাষাঢ়ায় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ, রাজাকারদের ফাঁসির দাবি ও ব্লগার রাজীব হত্যার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশের আগে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড গেঁথে দেন এবং ফলক উন্মোচন করেন।
কিন্তু সেই ‘রাজীব চত্বর’ ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই শহরের ডিআইটি এলাক থেকে মিছিল নিয়ে এসে রাজীব গুড়িয়ে দেয়া হয়। যে মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এরপর ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানী ঢাকায় শাপলা চত্ত্বর কায়েম করা হয়। আর এই শাপলা চত্ত্বরে ঢাকার পাশ্ববর্তী জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের নেতারা সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন। এভাবে একের পর এক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতাকর্মীদের সাথে ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিদের নজর কাড়ে।
তাদের যে কোনো কর্মসূচিতেই সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা অংশগ্রহণ করেন। তবে এই আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্টতাও পরিরক্ষিত হয়। ২০২১ সালের (২০ মার্চ) আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন।
যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের (১৩ মে) বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার।
ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা। ওই বছরের (২০ মে) নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেন। ২০২১ সালের (১২ ফেব্রুয়ারি) মসজিদ ভেঙে শপিংমল ও মাদ্রাসা উচ্ছেদ করে পার্ক করার অভিযোগ এনে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে সমাবেশ করে নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ। এদিন জুমার নামাজের পর শহরের চাষাঢ়া এলাকার বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
কিন্তু এরপর থেকেই অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বিভক্তি হয়ে পরেন হেফাজত ইসলামী। গত ২০২৪ সালের (৪ অক্টোবর) চাষাঢ়ার বাগে জান্নাত জামে মসজিদে প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতের কমিটি ঘোষণা করেছিলেন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। তবে ওই সম্মেলনে মাওলানা আব্দুল আউয়ালসহ নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের বড় একটি অংশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন না। ওই কমিটিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে জেলা সভাপতি এবং খেলাফত মজলিসের নেতা এবিএম সিরাজুল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
মহানগর কমিটিতে মুফতি হারুনুর রশিদকে সভাপতি এবং মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পরই এ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া এবিএম সিরাজুল মামুন দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং ঘোষিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন। তখন এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে জেলা কমিটির মূল দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া এবং জেলা ও মহানগরের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মতামত উপেক্ষা করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরে মাওলানা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল নারায়ণগঞ্জে ডিআইটি মসজিদে আসেন।
তারা উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এবং সম্মেলনে ঘোষিত কমিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানান। ওই কমিটি ঘোষণা ও প্রতিনিধি সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান।
সংগঠনের একাংশ ফেরদাউসুর রহমানকে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরোধিতা করে আসছে। এর মধ্যেই গত (৩০ সেপ্টেম্বর) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও মহানগর হেফাজতের সাবেক প্রচার সম্পাদক জাহিদ হাসান হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানসহ হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে দায়ী করেছিলেন।
হেফাজতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি ২০২৪ সালের প্রতিনিধি সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই সেখানে উপস্থিত থাকলেও নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সংগঠনটির দুই নায়েবে আমীরের কেউই ওই সম্মেলনে ছিলেন না। গত বুধবার নতুন কমিটি ঘোষণার অনুষ্ঠানেও আগের কমিটি ঘিরে থাকা বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। ফলে নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজানো হলেও নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের দীর্ঘদিনের বিভক্তি কতটা দূর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।


