জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি ও বিএনপি নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ ছড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে। ইতিমধ্যে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীকে নারায়ণগঞ্জ থেকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছেন। তা ছাড়া এনসিপি নেতাকর্মীদের তেলাপোকার মতো পিষে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন। এদিকে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক শওকত আলী নারায়ণগঞ্জের বিএনপির বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের দাবি জানিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন চাঁদাবাজি, ঝুট সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা ও ফ্যাসিস্টের দোসরদের বিরুদ্ধে কথা বললেই বিএনপি ও ছাত্রদলের গাত্রদাহ হয়।
এদিকে আল-আমিনের বক্তব্যের পাল্টা জবাবে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা বলেছেন, সমকামিতা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনাদের এনসিপি-জামায়াত জোটের নেতাদের গাত্রদাহ হয়। বর্তমানে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে। এদিকে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই বিএনপির বিরুদ্ধে জড়ালো মন্তব্য করলে ও মাঠে আসেনি এনসিপি। এদিকে বিএনপি মাঠে নেমে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
একদিকে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে মহানগর বিএনপি, অন্যদিকে সেই কর্মসূচি ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন গণসংহতি আন্দোলন, এনসিপির নেতাকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী। এর ফলে মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ, যা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা এনসিপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সমকামিতা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনাদের এনসিপি-জামায়াত জোটের নেতাদের গাত্রদাহ হয়।
তিনি বলেন, এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজের গায়ে আঘাত লাগার ঘটনাকে যেমন ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন, তেমনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের লাখো নেতাকর্মীর হৃদয়ে আঘাত করে।
তিনি আরো বলেন, ‘আপনার রক্ত ঝরানো যেমন পার্সোনালি নিয়েছেন, তেমনি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী লাখ লাখ নেতাকর্মী আপনার কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকেও পার্সোনালি নিয়েছে। এতে তারেক রহমান বা অন্য কোনো নেতাকে দোষারোপ করে লাভ নেই। ইট মারবেন তো পাটকেল খাবেন।’
তিনি বলেন, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে শিষ্টাচারও থাকা উচিত। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত।
আশা বলেন, একাত্তর যেমন কোনো একটি দলের সম্পত্তি নয়, তেমনি চব্বিশও কারও একার নয়। ছাত্র, জনতা ও শ্রমিকদের সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমেই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এটিকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা বাদ দিতে হবে। বিএনপির ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এ সময় তিনি গুম ও হত্যার শিকার বিএনপির নেতাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গে আবুল কাউসার আশা বলেন, অতীতে একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম, আদালত ও কারাগারে সময় কাটানোর স্মৃতি থাকায় অনেক সময় তাদের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার আগে তিনি সংযম প্রদর্শন করেন।
গত (১ আগষ্ট) নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়া এলাকায় এক বিক্ষোভ সমাবেশ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন বলেন, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীকে আমি মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম। সে যদি ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জে পা দেয়ার দুঃসাহস দেখায়। তাদের আমরা প্রতিহত করবো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর ইতিহাসে এমন তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রনায়ক আছে এমন কোন ইতিহাস কী আছে? নেই। সেই তারেক রহমানকে নিয়ে সামান্য তেলাপোকা ও ছাড়পোকারা যদি কিছু বলে আমাদের উচিত তাদের পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলা।
তিনি আরো বলেন, আরএফএলের সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে সে চাকরি করতো। আমার কাছে সেই ছবি আছে। সে লজিং মাস্টার ছিল। আাসিফ থেকে শুরু করে নাহিদ, হাসনাতরা পাঁচ আগষ্টের আগ পর্যন্ত কই ছিল? তারা আওয়ামী লীগের লুঙ্গির নিচে ছিল। ছাত্রলীগের লুঙ্গির নিচ থেকে বের হয়ে আজ তারা বড় নেতা। ১৭ বছরের আমাদের নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা চিন্তা করলে তোদের তো হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার কথা। তোরা বড় বড় কথা বলিস। তেলাপোকা-ছাড়পোকাদের আজেবাজে বক্তব্যে সফল প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের কিছুই হবে না।
এদিকে বর্তমানে রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার-সোনারগাঁও-শহর এলাকায় নিয়মিত এনসিপির বিরুদ্ধে মশাল মিছিল, বিক্ষোভ মিছিল, শোডাউন চলছে। যাকে ঘিরে রাজনৈতিক মাঠে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন বিএনপিকে উল্লেখ করে লিখিছেন, চাঁদাবাজি, ঝুঁট সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা ও ফ্যাসিস্টের দোসরদের বিরুদ্ধে কথা বললেই বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তিনি দাবি করেন, অপকর্মের সমালোচনা করায় বিভিন্ন মহল অযথা আপত্তি তুলছে।
আব্দুল্লাহ আল আমিন অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জের বাস ও টেম্পুস্ট্যান্ড এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কারা চাঁদাবাজি করেছে, তা সবাই জানে। তিনি দাবি করেন, ফতুল্লায় একটি গার্মেন্টসে আগুন দেওয়ার হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ও দল থেকে বহিষ্কৃত রিয়াদ চৌধুরী এখনও বিএনপির নেতা হিসেবে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ঝুট ব্যবসার দখল নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের গোলাগুলিতে এক মাদ্রাসার ১০ বছর বয়সী শিশু গুলিবিদ্ধ হলেও এ নিয়ে কারও আপত্তি নেই। তবে ঝুঁট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বললেই আপত্তি তোলা হয়। তার দাবি, ঝুঁট সন্ত্রাসের মামলায় কারাভোগ করা ছাত্রদল নেতারাও এনসিপির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন।
স্ট্যাটাসে আব্দুল্লাহ আল আমিন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এর নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি শেখ হাসিনাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং গণআন্দোলনকে ‘তাণ্ডব’ বলেছিলেন। এমন একজনকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বললেও বিএনপির নেতাদের আপত্তি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হাতেমকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার পর তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে একজন এমপির ছেলে বহিষ্কার হয়েছেন, যুবদলের এক সাধারণ সম্পাদক শোকজ হয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনায় লজ্জা না পেলেও কেউ বিষয়গুলো তুলে ধরলেই অনেকে ক্ষুব্ধ হন। আওয়ামী লীগ এবং ফ্যাসিস্ট ছাড়া কারও সঙ্গে আমাদের শত্রুতা নেই। তবে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, ঝুঁট দখল ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আমরা কথা বলবই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে আমরা কারও পরোয়া করি না।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক শওকত আলী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, নারায়ণগঞ্জের বিএনপির বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি এসব অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
শওকত আলী লেখেন, সারাদেশ বাদ দেন, নারায়ণগঞ্জের বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের ৫ আগস্টের পরের হিসাবটা শুধু কেউ নেন পারলে। কে কয় টাকা কামাইছে, বাড়ি-গাড়ি কিনছে। সাধারণ মানুষ, ফুটপাতের অটোরিকশাচালক, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও পুলিশের কাছ থেকে তথ্য নিলে জানা যাবে কোন দলের নেতারা চাঁদা দাবি করেন, মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড়ানোর জন্য তদবির করেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করেন।
পোস্টে তিনি আরও অভিযোগ করেন, এমনকি জুলাই শহীদদের পরিবারও মামলা বাণিজ্য থেকে রেহাই পায়নি। বাধ্য হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ দখল এবং অর্থ লেনদেন নিয়েও তদন্তের আহ্বান জানান তিনি। তাহলেই বুঝবেন জুলাই কারা বিক্রি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, কারা লুটপাট করেছে আর কাদের ওপর দোষ চাপিয়েছে।