স্বাধীনতার আগের ও পরের বাংলাদেশে বামপন্থি ছাত্ররাজনীতির ছিল সমৃদ্ধ ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতার যুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের আগে-পরে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলো ছিল নেতৃত্বের পর্যায়ে। তাদের পরিকল্পনাতেই দেশের বেশিরভাগ গণআন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফিকে হয়ে গেছে। বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকার চেষ্টা করছে বাম রাজনৈতিক নেতারা।
বর্তমানে সারাদেশের ন্যায় নারায়ণগঞ্জে বাম রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঢিলেঢালা হয়ে পরেছে। বর্তমানে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে বামসহ ছোট রাজনৈতিক দলগুলো। তারা না পারছে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে, না পারছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একত্মতা প্রকাশ করতে। তা ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর থেকেই বিগত দিন থেকে আরো কঠিন সংকটের মুখে এই রাজনৈতিক দলটি। এদিকে দুই দশক সময় ধরে বাম রাজনৈতিক দলগুলো বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা নামে একটি জোটের মাধ্যমে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই আন্দোলনে তারা একদিকে যেমন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না, জনসমর্থন পাচ্ছে না, অন্যদিকে নিজেরাও বিকশিত হতে পারছে না। এতে তৈরি হচ্ছে উপদল, তৈরি হচ্ছে উপদলীয় কোন্দল।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর অনেকেই মনে করেছিল এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। বিশেষত যুদ্ধাপরাধের বিচার যখন শুরু হয় তখন বাম দলগুলোর সামনে একটি বড় সুযোগ সামনে এসেছিল। এই বাম দলগুলো জনগনের সঠিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে অনেক ভূমিকা রেখেছে।কিন্তু আওয়ামী লীগে ও বিএনপির বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার প্রভাব দেখে ও তাদের অর্থ সম্পদের লোভে অনেকে ছুটে গেছে সেই দলের পিছু। তা ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সাংসদ নির্বাচনে চরম ভরাডুবি আরো ব্যাপক অস্বতিত্ব সংকটে বেকায়দায় পরে বাম রাজনীতি চোরাবালিতে আটকে গেছে।
সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামদলগুলোর চরম ভরাডুবি এই রাজনীতিকে নতুন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তবে কি এই দেশে বাম রাজনীতি অচল হয়ে গেল? এটা কি বাম রাজনীতির সীমাবদ্ধতা, নাকি দলগুলোর সাংগঠনিক ব্যর্থতা? এবারের নির্বাচনে ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়া’র লক্ষ্যে নির্বাচনের আগে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে জোট গঠন করে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ অন্যতম। নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ১৪৭ জন প্রার্থীই বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটের সংখ্যা ছিল একেবারেই নগণ্য, এমনকি অনেক কেন্দ্রে বাম প্রার্থীরা কোনো ভোটই পাননি।
অথচ তাদের প্রচারণায় ছিল বৈষম্যবিরোধী বক্তব্য, কর্মসংস্থানের দাবি, সামাজিক ন্যায়ের কথা। আইন অনুযায়ী, একটি আসনে যত সংখ্যক ভোট পড়বে, তার আট ভাগের এক ভাগের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। বাম দলগুলোর প্রার্থীরা প্রতিটি আসনেই জামানত হারিয়েছেন। এই ফল বাম রাজনীতির সাংগঠনিক শক্তি, জনভিত্তি ও কৌশলগত বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি করেছে। বর্তমানে ধীরে ধীরে বাম রাজনীতি শেষ হওয়ার পথে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিবি) নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম যুগের চিন্তাকে বলেন, বিগত দিনে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে যে সকল লড়াই সংগ্রাম প্রয়োজন তা আমরা বর্তমানে ও চালিয়ে যাচ্ছি। বিগত দিনে স্বৈরাচার সরকারের বিরোধিতা করে মাঠে ছিলাম। বর্তমান সরকারও যদি এরকম স্বৈরাচারিতা করে আমরা মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়বো।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ও অন্তবর্তী কালীন সরকার বাণিজ্য চুক্তির নামে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ ও চট্টগ্রামের পোর্টের যারা দাবার ক্ষেত্রে যে চুক্তিগুলো করেছে। এই সকল চুক্তির বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন সারাদেশে অব্যাহত রয়েছে। জেলা পর্যায়েও আমরা এ আন্দোলন পরিচালনা করে যাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদ আমরা বিগত দিনে যেভাবে রাজপথে ছিলাম বর্তমানে আরো ভালোভাবে রাজপথের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে অতীতের মতোই আমরা লড়াই সংগ্রামে আছি।
ন্যাপ নেতা এড আওলাদ হোসেন যুগের চিন্তাকে বলেন, বাম রাজনীতি খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমজীবী মানুষের আস্থার রাজনীতি। বতমানে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জোয়ার চলছে। যাকে ঘিরে গরীব মানুষের রাজনীতি নিয়ে কথা বলার লোকের সংখ্যা ও কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বতমানে ভোগের রাজনীতি চলছে, অল্প সময়ে মানুষ অনৈতিক প্রন্থায় বড়লোক হওয়ার পিছনে দৌড়াচ্ছে। যাকে ঘিরে কেউ আর নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে আগ্রহী নই। যাকে ঘিরেই বতমানে বাম রাজনীতি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
তিনি আরো বলেন, বিগত দিনে আমরা বাম নেতারা স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনে ছিলো। বতমান সরকার ও কোন স্বৈরাচারী দিক বেছে নিলে আমরা আবারো এদের বিরুদ্ধে কমসূচি নিয়ে মাঠে নামবো।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব আবু নাঈম খান বিপ্লব যুগের চিন্তাকে বলেন, আমরা বিগত দিনের মতোই আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম চলছে। বতমান সরকার ও অন্তবর্তী কালীন সরকার বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ ও চট্টগ্রামের পোর্টগুলোর ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে যে চুক্তিগুলো করেছে তা বাতিলের দাবিতে আমরা রাজপথে রয়েছি।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর লিস দেওয়ার পাঁতারা চলছে এটা বাতিলের দাবিতে আমরা দ্রুত মাঠে নামবো। দেশ স্বাধীন দেশ আমরা কোন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয়।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে। আমরা বাম নেতারা সর্বদা মালিক পক্ষের বিরোধী করায় বর্তমানে বিভিন্ন পক্ষ আমাদের দমাতে নানা পায়তারা করছে। কোন ষড়যন্ত্র আমাদের কিছু করতে পারবে না।