# তাঁর কাঁধে চড়ে নিষিদ্ধ আ.লীগকে পুনর্বাসিত হতে দেওয়া হবে না : এড.সাখাওয়াত
# কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার হওয়া প্রয়োজন : আব্দুল জব্বার
# গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা দেখতে চায় : শওকত আলী
# পুনর্বাসন করার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকবো : আশা
# আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আমরাও নজর রাখছি : সজল
# সর্বদা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিংয়ে থাকবে : খোরশেদ
# আইভী নিষিদ্ধ আ.লীগের নেত্রী, তাকে মেনে নিবে না : রনি
# উচ্ছ্বাস জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি চরম অবমাননা : অভি
একবছর পর কারামুক্ত হয়ে দেওভোগের বাসায় ফিরেছেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। আইভীর মুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা উচ্ছাস দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে বিএনপি,এনসিপি নেতারা ক্ষোভ ঝাড়ছেন। সরগরম সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম। উত্তাপ সারাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। এরমাঝে আইভীর আইনজীবী এড.আওলাদ হোসেন মন্তব্য করেছেন, সামনের নির্বাচনেও আইভী মেয়র পদে লড়তে পারেন।
এতে উত্তাপ ছড়িয়েছে আরো কয়েকগুন। তবে আইভী কারামুক্ত হবার পর এনিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। শুধু এটুকু বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার বলেছেন, তারা মানবিক সরকার গঠন করবেন। মানবিক হবেন। “আমি চাই সকলকে নিয়ে মানবিক সরকার গঠিত হোক। জেলে আমার মতো আরো অনেক মায়েরা আছেন, তারা নিরপরাধ। আশা করি, সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবেন।’
তবে আইভীর মুক্তির পর বিএনপি-এনসিপি নেতারা রয়েছেন সজাগ। আইভীর কাঁধে চড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যাতে পুনর্বাসিত হতে না পারেন এনিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হওয়ার কোন সুযোগ নাই।
তাছাড়া আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী জামিনে মুক্ত পেয়েছে, এখন সে যদি আবার স্বৈরাচার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চায় তাহলে সরকার সে বিষয়ে ছাড় দিবে না। তিনি বলেন, আইভী যদি নিষিদ্ধ সংগঠনকে আবারো জাগরণের চেষ্টা করে তাকে আইনের সম্মুখীন হতে হবে। তা ছাড়া মুক্তির পর তার দেওয়া বক্তব্যে বুঝা গেলো তিনি বাসায় থাকবে আর রাজনীতি নয় তার ব্যাক্তিগত জীবন নিয়েই থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কোন আওয়ামী লীগ নেত্রীকে নারায়ণগঞ্জের মানুষ কিছুতেই মেনে নিবে না। তা ছাড়াও উনি গ্রেফতারের দিন যেভাবে 'জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগান দিয়েছে আবার ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর স্মরণে ফুল দিয়েছে। যে দল দেশের জনগণের জীবন ব্যবস্থাকে ধ্বংসসহ লাখো লাখো পরিবারের জীবন নিয়েছে সেই পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়া দেশের সাথে বেঈমানী সেই হিসেবে সেই দল ও দলের নেতা-নেত্রীদের নারায়ণগঞ্জবাসী ও দেশবাসী কখনো মানবে না।’
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা যুগের চিন্তাকে বলেন, আইভীর কারামুক্তির বিষয়টি হলো আইনগত পক্রিয়া। যে যত বড় অপরাধী হোক একদিন না একদিন কারামুক্ত হতে হবেই। তা ছাড়া সকলেই অবগত আছেন বাংলাদেশ ২০০০ হাজারের অধিক সন্তান তাদের জীবন দিয়ে এই নতুন স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। রক্তের সাথে বেঈমানি করে কেউ আবার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে পারবে না।
তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী এই নেত্রী তার কর্মকাণ্ডের বিচার পেয়ে এসেছে। এখন সে রাজনীতি নয় নিজের পারিবারিক জীবন নিয়ে চলবে। আর এর বাহিরে কেউ যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চিন্তা মাথায় আনে তাদের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকবো পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বার যুগের চিন্তাকে বলেন, আদালত আইনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, সেলিনা হায়াৎ আইভী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, এটি আদালতের বিষয়। তবে যেসব অভিযোগ ও মামলার প্রেক্ষিতে তিনি কারাভোগ করেছেন, সেগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার হওয়া প্রয়োজন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। তিনি আরও বলেন, দেশের বিচার ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করুক এবং জনগণ প্রকৃত সত্য জানতে পারুকÑএটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক ও সংকট অনেকটাই কমে আসবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সভাপতি শওকত আলী যুগের চিন্তাকে বলেন, আদালত দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং তারা আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। তবে জামিন পাওয়া মানেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়।
তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার হওয়া প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য উদঘাটিত হবে। তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের চেয়ে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। আইভীর মুক্তিকে আমরা একটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছি।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ এখন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, বরং জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা দেখতে চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল যুগের চিন্তাকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী কারামুক্ত হয়ে নিজ বাসায় এসেছেন। বিচার বিভাগ তাকে জামিনে মুক্তি দিয়েছে এখন সে যদি আবার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে সেই ক্ষেত্রে তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। তিনি বলেন, আমরা যুবদল অন্যায়ের বিরুদ্ধে যতটা সোচ্চার তেমনইভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যাতে পূনরায় পুনর্বাসন হতে না পরে সেদিকে ও আমরা সোচ্চার রয়েছি। আওয়ামী লীগের কোন নেত্রী কিংবা নেতা কেউ আবারো নারায়ণগঞ্জের মাটিতে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে পারবে না।
নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি যুগের চিন্তাকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভীকে বিচার বিভাগ জামিনে মুক্তি দিয়েছে। এখন সে যদি সেই জামিনকে পুঁজি করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে তাহলে এটা থাকবে তার ভূল ডিশিসন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি নিষিদ্ধ দল, এই দলকে পুনর্বাসিত যারাই করতে চাইবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের প্রতিহত করবে। তা ছাড়া আইভী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেত্রী, তাকে নারায়ণগঞ্জবাসী মেনে নিবে না। তিনি যদি কোন ইস্যু নিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্জাগণের চেষ্টা চালায় আমরা ও সে বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকায় থাকবো।
মহানগর বিএনপি নেতা মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ যুগের চিন্তাকে বলেন, সাবেক মেয়র আইভী নারায়ণগঞ্জে আসলে ও সে আওয়ামী লীগকে পূর্ণবাসন করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, আইভী নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার কারণে তিনি এখন কারামুক্ত হয়ে বাসায় থাকলে ও সর্বদা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিংয়ে থাকবে।
মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আশিকুর রহমান চৌধুরী অভি যুগের চিন্তাকে বলেন, ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর কারামুক্তিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি চরম অবমাননা।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে গণহত্যা, নিপীড়ন ও আন্দোলন দমনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যেকোনো অপচেষ্টা আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি। শহীদদের রক্ত এখনো শুকায়নি, আহতদের আর্তনাদ এখনো থামেনি। এমন পরিস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থানবিরোধী শক্তিকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া জাতির আকাক্সক্ষার পরিপন্থী।
তিনি আরো বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আদালতের জামিন কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে দায়মুক্ত করে না। জুলাইয়ের গণআকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তি ও শক্তিগুলোর ভূমিকার বিচার ইতিহাস করবে এবং জনগণও তাদের অবস্থান ভুলে যায়নি।
তিনি বলেন, আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনরুজ্জীবিত করার কোনো অপচেষ্টা হয়, তবে নারায়ণগঞ্জের গণতন্ত্রকামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে কোনো আপস নয়। জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে কোনো বিশ্বাসঘাতকতার পুনর্বাসন নয়।
গত ৩ জুন দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় তাঁর নিজ বাসভবন নারায়ণগঞ্জের চুনকা কুটিরে পৌঁছেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী । এরআগে গত বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা ১০ মিনিটে কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। আইভী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক তিনবারের মেয়র, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার একবারের চেয়ারম্যান এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে আইভী’র বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলা হয়েছে। গত ১০ মে ১০টি মামলায় আইভীর জামিন আপিল বিভাগ বহাল রাখেন হাইকোর্ট।
অন্য দুইটি মামলায় আইভী হাইকোর্টে জামিন পান। কিন্তু এই দুইটি মামলায় জামিনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে যায়। পরে গত ১৭ মে এই দুইটি মামলায়ও তার জামিন বহাল রাখার আদেশ দেয় আপিল বিভাগ। সেই হিসেবে আইভী কারামুক্তি পান। এর আগে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৮ আগস্ট সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়রের পদ থেকে অপসারণ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
নারায়ণগঞ্জের প্রতাপশালী সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ অনেক নেতাই নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও আইভী তার বাসায়ই ছিলেন। এরপর ২০২৫ সালের ৮ মে রাতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের বাসায় গেলে তার হাজার হাজার সমর্থক তার বাসা ঘিরে রাখে। ছয় ঘন্টা পরে ৯ মে ভোর পৌনে ছয়টায় আইভী পুলিশের কাছে ধরা দেয়। গ্রেফতারের সময় তিনি ও তার বিপুল সংখ্যক সমর্থক ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন।