ঐক্য ধরে রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ
শিল্পায়ন যত সমৃদ্ধ হচ্ছে নাগরিক জীবন ততই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে; পরস্পর বিরোধী এমন অবস্থান দেশের আর কোথাও না দেখা গেলেও নারায়ণগঞ্জ নামক দেশের তথাকথিত সমৃদ্ধ জনপদের বাস্তব চিত্র ঠিক এমনটিই। এক সময়ের প্রধান রফতানি পন্য পাটশিল্প এবং বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্প সহ বিভিন্ন ধরনের হালকা, মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে সমগ্র নারায়ণগঞ্জ জুড়ে। প্রাচীনকাল থেকেই শিল্প বাণিজ্য সমৃদ্ধ এলাকাটিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনের বসবাস।যা এখনও চলমান।
শিল্পায়নের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে নগরায়ন বেড়েই চলেছে।সে কারণে প্রচলিত ধারণার কোন গ্রাম আর এখন নেই বললেই চলে।সময়ের প্রয়োজনে কিছু শিল্প অবলুপ্ত হলেও তার জায়গা নিয়েছে অন্য শিল্প।শিল্পের ধরণ পাল্টালেও শিল্পায়ন কখনই থেমে থাকেনি।বহু আগে থেকে বেশকিছু পণ্যের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে অবস্হিত।সংগত কারনেই সমগ্র দেশের বিশাল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ।
লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নাগরিক পরিষেবা নির্দিষ্ট স্হানে থেমে যাওয়ায় জনজীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ।বিভিন্ন মহলে আকুতি জানিয়ে কোন লাভ হয়নি।দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নারায়ণগঞ্জবাসী সম্প্রতি স্বীয় উদ্যোগে মাঠে নামে।অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী সিটি কর্পোরেশন, স্হানীয় সাংসদ জেলা প্রশাসন সহ দলমত নির্বিশেষে সকল পক্ষের সমর্থন এবং অংশগ্রহণে ফুটপাত সহ বিভিন্ন রাস্তা হকারমুক্ত হয়।সব পক্ষই অংগীকার করে জনদুর্ভোগের অন্যান্য কারনসমূহ দূর করা হবে,স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হবে জনজীবনে।এমন আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে চাইলেও আশংকা এসে ভর করে।যেসব অর্থলোভী পিশাচের ছত্রচ্ছায়ায় জনদুর্ভোগের সৃষ্টি,তারা কি এত সহজেই হার মানবে?
এমন আশংকা দৃঢ়তা পায় সড়ক জুড়ে অটো রিক্সার দাপিয়ে বেড়ানো দেখে,ফুটপাতে আবারও হকারদের আনাগোনা দেখে, ফুটপাতেই পূনর্বাসনের দাবিতে মিছিল মিটিং দেখে!ধারনক্ষমতার কয়েকগুণ জনসংখ্যার চাপে বিপর্যস্ত শহরটি সাধারণ মানুষের চলাচল উপযোগী,যানজটমুক্ত করতে হকারমুক্ত ফুটপাত এবং অটোরিকশার আধিক্যমুক্ত সড়কের বিকল্প নেই।ফুটপাত ইস্যুতে প্রাথমিক সাফল্য পাওয়া গেলেও তা কতদিন ধরে রাখা যাবে সে ব্যাপারে সংশয় রয়ে গেছে।অটোর আধিক্য কমানোর বিষয়টি বক্তৃতা বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে,কার্যকর কোন পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান হয়নি।এমন অবস্থায় আশংকা জাগা খুবই স্বাভাবিক,যে উদ্যমে কাজ শুরু হয়েছে তা কি আদৌ টিকে থাকবে?
নানাবিধ সমস্যায় বেহাল নারায়ণগঞ্জবাসীকে নতুন করে দেখানো স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিবে কি?বার বার স্বপ্নভংগের কারণেই এমন আশংকা।সুদীর্ঘ কালের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় নারায়ণগঞ্জবাসীর ন্যায্য দাবি পূরণে সুবিধাভোগী শ্রেণীর কেউ এগিয়ে আসবে তো না ই বরং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বাধা প্রদান করবে ।তাই স্বীয় দাবি আদায়ে সবাইকে একাট্টা হয়ে কাজ করতে হবে, তবেই যদি সাফল্য আসে।প্রশ্ন জাগে, যে অঞ্চলটি জাতীয় কল্যাণে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে তার ক্ষেত্রে এমন বৈষম্যমূলক আচরণ কেন?
এর সহজ উত্তর হতে পারে; স্হানীয় প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণে নীতিনির্ধারক মহলের কাছে সঠিক চিত্র না পৌঁছানো,কারও কারও মতে উন্নত নারায়ণগঞ্জ যাদের অবৈধ উপার্জনের অন্তরায়, তাদের অপচেষ্টা।কারণ যাই হোক না কেন ভুক্তভোগী তো আর তারা নয়, সাধারণ মানুষ! কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে সমস্যা সমাধানে।হকার উচ্ছেদ ইস্যুতে যে ঐক্য গড়ে উঠেছে তা ধরে রাখতে পারলে দুদিন আগে পরে সব সমস্যারই সমাধান হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা,যোগাযোগ ব্যবস্থা, নাগরিক পরিষেবা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে দৈন্যদশা তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাধারণ মানুষের ঐক্যের বিকল্প নেই।
স্বার্থান্বেষী মহল নানারকম ছলচাতুরি, হিংস্রতা, প্রলোভনের মাধ্যমে ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টায় বরাবরের মতই তৎপর থাকবে, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।বাসযোগ্য নারায়ণগঞ্জ গড়তে প্রয়োজনীয় সংস্কার,আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, সবকিছুই নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর। এখন দেখার বিষয় হকার ইস্যুতে গড়ে ওঠা ঐক্য বজায় থাকে কি না? ঐক্য বজায় রেখে অন্যান্য দাবি আদায়ে এগিয়ে যাওয়া যায় কি না?
সোজা কথায় ঐক্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল চ্যালেঞ্জ।নারায়ণগঞ্জবাসী কি পারবে না এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে গন্তব্যে পৌঁছাতে? এর উত্তরের সাথেই জড়িয়ে আছে ভবিষ্যত নারায়নগঞ্জের অবস্থান। লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।


