নারায়ণগঞ্জের ৫টি উপজেলা পরিষদে নির্বাচনকে ঘিরে একাধিক প্রার্থী ব্যানার ফেস্টুন সাজিয়ে (উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী) লিখে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা। তা ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন করে প্রার্থী থাকায় নির্বাচনকে ঘিরে সংঘর্ষের আভাস লক্ষ্য করা গিয়েছে। এদিকে বর্তমানে পাল্টা পাল্টি নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন ধস্তাধস্তি। এমতা অবস্থায় স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদের বিদ্যমান কাঠামোকে ঘিরে দ্বিধায় রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বর্তমান কাঠামোর আওতায় উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে এই অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে। যাকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা কমার আশঙ্কা লক্ষ্য করা যাচ্ছে প্রতিটি উপজেলায়, কমতে শুরু করেছে অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব। এদিকে সদর উপজেলা, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, বন্দর উপজেলায় জামায়াত-বিএনপি-এনসিপির নির্বাচনকে ঘিরে স্বপ্ন ভঙ্গের পথে।
এদিকে বিএনপির এমন অবস্থান নতুন নয়, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার সরকার এরশাদ আমলে চালু হওয়া উপজেলা পরিষদ বাতিল করেছিল। একই বছরের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি করে তা বিলুপ্ত করা হয়েছিল। এবার প্রতিটি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ তৈরির সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার এটিকে প্রশাসনিক সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরলেও, স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা এটিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
১৯৯১ সালের মার্চে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার সরকার উপজেলা পরিষদ বাতিল করে। ওই বছরের নভেম্বরে ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন) (রদ) অধ্যাদেশ ১৯৯১’ পাস করে উপজেলা পরিষদ বিলোপ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করলেও নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করেনি। এতে করে যে অধ্যাদেশবলে উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা আর সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপজেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে উপজেলা পরিষদ কার্যত সংসদ সদস্যদের দয়া ও সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বে চলে যায়। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে কার্যত স্থানীয় সরকারের সর্বজনীন চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রায় সব শীর্ষ পদই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে ছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। পরে দেশের সব (৪৯৩টি) উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। তাদের জায়গায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদগুলো খালি থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শুরুতে করতে চাচ্ছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বলা হলেও, সংশ্লিষ্ট মহলগুলো মনে করছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সরকার তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায়। তা ছাড়া বর্তমানে উপজেলা পরিষদ বাতিলে দেশসহ নারায়ণগঞ্জের তৃণমূলে ফিরছে স্বস্তি¡। সকলেই বলছে, এবার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হলে নিজ দলীয় নেতাদের মাঝে কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসতো যাকে ঘিরে একে অপরের দ্বন্দ্বে চিপায় পরতো কর্মীরা। যাকে ঘিরে উপজেলা পরিষদ বাতিল বর্তমানে দলীয় কোন্দল রক্ষার দৃষ্ঠান্ত স্থাপন।


