শামীম যখন দুবাই, নীলকন্ঠী তখন কারাগারে
ফরিদ আহম্মেদ বাধন
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
শামীম যখন দুবাই, নীলকন্ঠী তখন কারাগারে
সন্ত্রাসের জনপদ হিসেব নারায়ণগঞ্জ খ্যাতি অর্জন করেছিলো মূলত শামীম ওসমান ও তার গুন্ডা বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারইেএ শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে প্রতিবাদী কন্ঠে যে কথা বলেছিলেন তিনিই ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী। ১৯৯৩ সালে শহর আওয়ামীলীগের পদে আসিন হয়েছিলেন তিনি । ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময় শহরের গড ফাদার শামীম ওসমান দেশের বাইরে পালিয়ে ছিলেন। তখন আওয়ামীলীগের নেত্রী হিসেবে ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী দলকে গুছানোর কাজে ছিলেন। তৎকালীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌর সভার নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন তিনি। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১১ সালে পৌরসভাকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়। সেই সময়ও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। এভাবে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর দেশের অন্য সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের মতো তাকেও অপসারণ করা হয়। জেলার প্রভাবশালী নেতারা যখন গা ঢাকা দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তখনও তিনি তার দেওভোগস্থ নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। বৈষম্য বিরাধী মামলায় পুলিশ ২০২৫ সালের ৯ মে আইভীকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। এরপর ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান কারাবন্দী সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে সেই জামিনের বিরুদ্ধে আবেদন করে রাস্ট্রপক্ষ। ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। আবেদনগুলো আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় ছিলো। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের আবেদনে তাঁর জামিন ১৮ নভেম্বর স্থগিত হয়। এরপর গত ২৬ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্ট আইভীকে ৫টি মামলায় জামিন প্রদান করেন। তবে গতকাল আইভীকে সিদ্ধিরগঞ্জের একটি মামলায় আদালতের মাধ্যমে ‘শ্যোন এরেস্ট’ দেখানে হয়েছে। এতে করে আইভীর জামিন পুনরায় অনিশ্চিত দেখা দিলো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে যার অবস্থান ছিলো সেই আইভী বৈষম্য বিরোধী মামলায় জেল হাজতে রয়েছে। তবে এই মামলাগুলো থেকে কবে নাগাদ তিনি জামিন পাবেন তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবারের দ্বন্ধ একদিনের নয়। ১৯৮০’র দশক থেকে নাসিম ওসমানের বাবা একেএম শামসুজ্জোহা ও আলী আহাম্মদ চুনকার মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ শুরু হয়েছিলো। সেই মতেভেদ পরবর্তীতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে ওসমান পরিবারের নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান,শামীম ওসমান ও চুনকা পরিবারের আইভীর মধ্যে। এর কারন হিসেবে নারায়ণগঞ্জে যেখানেই ওসমানদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সেখানেই আইভীর প্রতিবাদ ছিলো। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বীর ছেলে ত্বকী হত্যান্ডের জোড়ালো প্রতিবাদ ও বিচার চাইতে গিয়ে আইভী বনাম ওসমান পরিবারের দ্বন্ধ আরো বেড়ে গিয়েছিলো। তবুও পিছু হটেনি আইভী। ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারী শহরে আইভী ও তার লোকজনের উপর সরাসরি সন্ত্রাসী হামলা করে শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা। তাদের উভয়ের দ্বন্ধ তৎকালীন আওয়ামীলীগের হাই কমান্ডও মিটাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এর আগে একটি টেলিভিশন টকশো চলাকালীন সময়ে দুইজনের মধ্যে যে বাকবিতন্ডা হয়েছিলো এ দৃশ্য দেশবাসী দেখেছিলেন। সেই সময় আইভীর সাহসেরও প্রশংসা করেছিলেন জনতা।
যে শহরে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করতেও সাহস পায়নি,সেই শহরে আইভী ওসমানদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে কথা বলেছিলেন। ত্বকী হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ ও বিচার চাইতে গিয়ে নিহতের বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির সাথে,আইভীও নানা রকম রক্তচক্ষুকে ভয় না করে যে প্রতিবাদ তিনি করেছিলেন এতে শহর ও শহরের বাইরের মানুষের কাছ থেকে তিনি বাহবা পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর,আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশের ন্যায় নাারয়ণগঞ্জেও বৈষম্য বিরোধী মামলা দায়ের করা হয়েছিলো। ৫ আগষ্টের পর পর শামীম ওসমান তার পরিবার পরিজন নিয়ে যখন দেশ ছেড়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন,তখন আইভী তার নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। তার দাবী ছিলো ‘তিনি কোনো হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নন’। আর তার অদম্য সাহস নিয়েই তিনি দেশেই অবস্থান করছিলেন। এরমধ্যে ২০২৫ সালের ৯ মে পুলিশকে আইভীর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করতে গিয়ে অনেক কষ্ট পোহাতে হয়েছে। আইভীকে যাতে পুলিশ এ্যারেষ্ট করতে না পারে সেজন্য নারায়ণগঞ্জের আপামর জনসাধারণ তার বাড়িতে গিয়ে মানব ঢাল সৃষ্টি করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে বৈষম্য বিরোধী ৫টি মামলায় পুলিশ তার বাড়ি থেকেই আটক করে। যখন শামীম ওসমান তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল গার্ড়ীতে চড়ছেন ও বিলাশবহুল বাড়িতে ঘুমাচ্ছেন তখন আইভী কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
যিনি বিষ হজম করে তাকেই নীলকন্ঠী বলা হয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রক্ষ চক্ষু,হুমকি ধামকীতেও দমে যাননি পৌর পিতা চুনকার মেয়ে ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী। বৈষম্য বিরোধী মামলায় তার জামিন হলেও পুনরায় সিদ্ধিরগঞ্জের একটি মামলায় তাকে শ্যোন এরেস্ট দেখানো হয়েছে। এতে আইভীর জামিন অনিশ্চিত । তবে নারায়ণগঞ্জের মানুষ মনে করেন,তিনি শুধু একজন মেয়রই নন, তিনি একজন কষ্ট সহ্য করার মতোই নীলকন্ঠি।
উল্লেখ্য, আইভী ১৯৬৬ সালের ৫ জুন নারায়ণগঞ্জের একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলী আহাম্মদ চুনকা এবং মাতা মমতাজ বেগম। আলী আহাম্মদ চুনকা বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে জয় লাভ করে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে আইভী জ্যেষ্ঠ। তিনি দেওভোগ আখড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি নারায়ণগঞ্জ প্রিপারেটরী স্কুলে ভর্তি হন এবং ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। অতঃপর তিনি মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭৯ সালে ট্যালেন্টপুলে জুনিয়র স্কলারশিপ পান এবং ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় স্টারমার্কসহ উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ১৯৮৫ সালে রাশিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য ওডেসা পিরাগোব মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন এবং ১৯৯২ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২-৯৩ সালে ঢাকা মিডফোর্ট হাসপাতালে ইন্টার্নি সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে তিনি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মিডফোর্ট হাসপাতালে এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে অনারারি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। তিনি ১৯৯৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ জয়লাভ করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আলী আহাম্মদ চুনকা ফাউন্ডেশন এবং নারায়ণগঞ্জ হার্ট ফাউন্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর নারায়ণগঞ্জ জেলার আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারয়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র হিসেবে জয়লাভ করেন। ২৭ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী সিটি কর্পোরেশন মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ গ্রহণ করেন। ২০২২ সালে ১৬ জানুয়ারি ২০২২ নির্বাচনে তৃৃতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ৫টি খুনের মামলায় তাকে জেলে পাঠানো হয়।


