খালিদ হাসান রবিন। সাধারণ মানুষ তো বটেই সন্ত্রাসীদের কাছেও কুখ্যাতি পেয়েছেন পিস্তল রবিন নামে। ফতুল্লার শিবু মার্কেট, রামারবাগ, কাঠেরপুল এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং আতঙ্কের নাম এই পিস্তল রবিন। গোটা এলাকায় একক আধিপত্য, মাদক ব্যবসা ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন। যার বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় অস্ত্র-মাদক, ভাংচুরসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
বিগতদিনে এই খালিদ হাসান রবিন ফতুল্লার যুবলীগ নেতা আজমত ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজামের অনুসারী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করে কাঠের পুল এলাকায় গড়ে তুলেছিলো মাদকের বিশাল সাম্রাজ্য। হাসিনা সরকারের পতনের পরে কিছুদিন গাঁ ঢাকা দিলেও বর্তমানে জেলা বিএনপি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির কিছু নেতার ছত্রছায়ায় আবার সেই আগের মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে রবিন। বর্তমানে নিজেকে তরুণ দলের নেতা পরিচয় দিয়ে বিএনপির ছায়ায় সন্ত্রাসী দল ভারী করছেন।
খালিদ হাসান রবিন ওরফে পিস্তল রবিনের যে সকল কারণে কুখ্যাতি
কাঠেরপুলের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী খালিদ হাসান রবিন মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে সে জালকুড়িতে ৫ তলা ভবন নির্মাণ করেছে এবং কেরানীগঞ্জের কোণ্ডায় প্লট ও ফ্ল্যাট কিনেছে বলে জানা গেছে।
যার বিরুদ্ধে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে প্রশাসনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে হাত মিলিয়ে মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
আরো জানা গেছে, খালিদ হাসান ওরফে রবিনের মাদক ব্যবসা শুরু ২০১০ সালের দিকে। তবে প্রথম মামলা হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর ১৫ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মাদক মামলা দায়ের করা হয় তার বিরুদ্ধে। যেটির নম্বর- ৩২। ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল আরো একটি মাদক মামলা দায়ের করা হয়। যার নম্বর-৮০।
এছাড়া ২০২২ সালের ১৩ জুন ঢাকা রমনা থানা পুলিশের কাছে মাদক সহ গ্রেপ্তার হন ফতুল্লার এই শীর্ষ মাদক কারবারি। ওই ঘটনায়ও একটি মামলা দায়ের করা হয় তার বিরুদ্ধে। যার নম্বর- ১৭/১৭৯।
২০২৩ সালের ১০ মে নরসিংদী জেলার শিবপুর থানা পুলিশের হাতে মাদক সহ গ্রেপ্তার হন রবিন। সে ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-১২। একই বছর ১৬ আগস্ট ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের হাতে মাদক সহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা দায়ের করা হয়। যার নম্বর-৪১।
২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর ফতুল্লা মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের হয়। যার নম্বর-১১। সেই মামলাটির বিবরণ- ফতুল্লা থেকে ২টি বিদেশী পিস্তল ও ১০ রাউন্ড গুলিসহ খালিদ হাসান রবিন ও তার সহযোগী ডালিমকে অস্ত্র ও মাদক গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সেদিন সকালে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রেসব্রিফিং করে সাবেক পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল পিপিএম জানান, খালিদ হাসান রবিনকে আটক করে তল্লাশিকালে তার কোমরের পিছন থেকে দুই রাউন্ড গুলি ভর্তি অবস্থায় একটি ৭.৬২ বোরের বিদেশী পিস্তল ও পকেট থেকে ৩২ রিভালবারের ২ রাউন্ড একটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়।
পরে তার দেয়া তথ্য ও সহায়তায় ফতুল্লার ভূইঘর গ্রামের সোনালী সংসদ খেলার মাঠের সামনে চাষাড়া সাইনবোর্ড গামী পাকা রাস্তার উপর হতে মো. ডালিমকে আটকের পর তার নিকট হতে ৭ পয়েন্ট ৬৫ বিদেশী পিস্তল, একটি খালি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড ৩২ বোরের রিভালবারের গুলি, ১ রাউন্ড ৯ এমএম পিস্তলের ৩ রাউন্ড ৩০৩ রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ও সিডিএমএস পর্যালোচনায় জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত খালিদ হাসান রবিনের বিরুদ্ধে দুইটি অস্ত্র ও ৬টি মাদক মামলাসহ সর্বমোট ৮টি মামলা রয়েছে। এর বাহিরে ও এই সন্ত্রাসী খালিদ হাসান রবিনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।
আরো জানা গেছে, ফ্যাসিবাদ সরকারের পতনের পর প্রশাসন যখন মানসিকভাবে কিছু দূর্বল, ঠিক সেই সুযোগ নিয়ে নিজের মাদক ব্যবসা পুরোপুরি চাঙ্গা করেন রবিন। সে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে ফেন্সিডিল ও গাঁজা এবং কক্সবাজার থেকে সড়ক পথে ইয়াবার চালান নিয়ে আসেন। অনেক সময় তার মাদকের চালান আসে নৌপথেও। রবিন রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেও মাদক পাইকারী বিক্রি করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া কিছুদিন পূর্বে এই খালিদ হাসান রবিনের বিরুদ্ধে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস.কে শাহিনের অফিসে ভাংচুরের অভিযোগ পরে থানায়।
এদিকে গত বুধবার রাতে কুতুব আইল কাঠেরপুল, কোতালেরবাগ, রামারবাগ, সস্তাপুর, শিবু মার্কেট এলাকায় ঝুট ও মাদক ব্যবসার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সোহেল ও খালিদ হাসান রবিন দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই কাঠেরপুল এলাকায় নয়া সিন্ডিকেটের আর্বিভাব ঘটে। সেদিন আরেক বিএনপি নেতা অলি উদ্দিনের অফিসে হামলা ও ভাংচুর চালায় এই রবিন বাহিনী।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী খালিদ হাসান রবিনের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় শতদল সংঘের আহ্বায়ক গোলজার হোসেন ও সদস্য সচিব ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে স্বারকলিপি দিয়েছে। তার স্বারকলিপিতে সোহেলকে মাদক ব্যবসায়ী দাবী করে তাকে দ্রুত গ্রেফতারের অনুরোধ জানানো হয়। যেখানে আরেক সন্ত্রাসী রবিনের নামই ছিলো না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংগঠনটির আহ্বায়ক গোলজার হোসেন ,খান বাহাদুর, বিএনপি নেতা হবুল, সাবেক যুবলীগ নেতা ও বর্তমান যুবদল নেতা মিঠু, ফারুক, বাপ্পি কাঠেরপুল এলাকায় সোহেল ও অলি গ্রুপকে কোনঠাসা করে ঝুট ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, ফুটপাত সব কিছুই নিজ নিয়ন্ত্রণে আনতে নানাভাবে পায়তারা শুরু করেছেন রবিন বাহিনী যেখানে কোনঠাসা হয়ে পরেছেন সোহেল বাহিনী।
যা নিয়ে ইতিমধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষের ঘটনা উঠে আসলে ও ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে ব্যাপক সংঘর্ষের আশঙ্কা পাওয়া যাচ্ছে। তা ছাড়া বর্তমানে রামারবাগ, কাঠেরপুলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে খালিদ হাসান রবিনের অস্ত্রের ভয়ে ভুগছে। কিন্তু প্রশাসন পুরোই নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছেন।
নানা অভিযোগের ব্যাপারে খালিদ হাসান রবিন ওরফে পিস্তল রবিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।