ফতুল্লায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির ফলে খুন, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভূমিদুস্যতা, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, ঝুট ব্যবসার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষের মতো অপরাধের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ট্যাগ ব্যবহার করে অপকর্র্ম করে ও পার পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি এলাকাগুলোর মাদকের তীব্র চক্রে জড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সোর্সের যোগসাজশে এখানে মাদক ব্যবসা দেদারসে চলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা থেকে এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিএনপির রাজনৈতিক ব্যানার ওঅসাধু শতকথা সামাজিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় ঝুট নিয়ে উত্তেজনা ও মাদক ব্যবসা বাড়ছে। ইতিমধ্যে ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে সোহেল ও খালিদ হাসান রবিন দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। একই সাথে ফতুল্লার মাসদাইর পতেঙ্গার মোড়, ঘোসেরবাগ, গুদারাঘাট এলাকায় একাধিক সিন্ডিকেট মাদক ব্যবসাসহ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রশাসন নিরব।
মাসদাইর ঘোসেরবাগ এলাকায় জাহিদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার পাশাপাশি একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা,চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি সহিংস ঘটনার অভিযোগও রয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, জাহিদের বাহিনী এতটাই প্রভাবশালী যে, কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জাহিদ প্রশাসনের নজরদারির তালিকায় থাকলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এই এলাকায় একাধিক বার পুলিশের উপর মাদক ব্যবসায়ীরা হামলা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফতুল্লার কাঠের পুল এলাকার আরেক ত্রাশ খালেদ হাসান রবিন ও সোহেল। তারা বিগত সময় ফতুল্লার যুবলীগ নেতা আজমত ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজামের অনুসারী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করে কাঠের পুল এলাকায় গড়ে তুলেছিলো মাদকের বিশাল সম্রাজ্য। হাসিনা সকার পতনের পরে কিছুদিন গাঁ ঢাকা দিলেও বর্তমানে জেলা বিএনপি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির কিছু নেতার ছত্রছায়ায় আবার সেই আগের মাদক সম্রাজ্য গড়ে তুলেছে রবিন ও সোহেল। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশাল কিশোর গ্যাং যা দ্বারা ফতুল্লা কাঠেরপুল এলাকায় মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করে তারা।
এদিকে নতুন রূপে ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় মাদক ও ঝুট ব্যবসার তীব্রতা কঠিন রূপ ধারণ করেছে। রাজনৈতিক ব্যানার ও কিছু অসাধু সামাজিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় ঝুট নিয়ে উত্তেজনা ও মাদক ব্যবসা বাড়ছে। এদিকে গত বুধবার রাতে কুতুব আইল কাঠেরপুল, কোতালের বাগ, রামারাবাগ, সস্তাপুর, শিবু মার্কেট এলাকায় ঝুট ও মাদক ব্যবসার ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে সোহেল ও খালিদ হাসান রবিন দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে।
এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই কাঠেরপুল এলাকায় নয়া সিন্ডিকেটের আর্বিভাব ঘটে। এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী খালিদ হাসান রবিনের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় শতকথা সংগঠনের আহ্বায়ক গোলজার হোসেন ও সদস্য সচিব ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে স্বারকলিপি দিয়েছে। তার স্বারকলিপিতে সোহেলকে মাদক ব্যবসায়ী দাবী করে তাকে দ্রুত গ্রেফতারের অনুরোধ জানানো হয়। যেখানে আরেক সন্ত্রাসী রবিনের নামই ছিলো না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোলজার হোসেন ,খান বাহাদুর, বিএনপি নেতা হবুল, সাবেক যুবলীগ নেতা ও বর্তমান যুবদল নেতা মিঠু ,ছাত্রদল নেতা ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত , কৃষকদল নেতা আহাদুর রহমান আহাদ, যুবদল নেতা রুবেল হোসেন, ফারুক, বাপ্পি কাঠেরপুল এলাকায় সোহেল ও অলি গ্রুপকে কোনঠাসা করে ঝুট ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, ফুটপাত সব কিছুই নিজ নিয়ন্ত্রণে আনতে নানাভাবে পায়তারা শুরু করেছেন রবিন বাহিনী যেখানে কোনঠাসা হয়ে পরেছেন সোহেল বাহিনী। যা নিয়ে ইতিমধ্যে দুই দফায় সংঘর্ষের ঘটনা উঠে আসলে ও ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে ব্যাপক সংঘর্ষের আশঙ্কা পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে প্রশাসন পুরোই নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছেন।
তা ছাড়া চাঁনমারী এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী পরিবার দাউদ পরিবার। দাউদ পরলোকগমন করার আগেই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক সম্রাট হিসেবে উত্থান ঘটে দাউদের বড় ছেলে শরীফের এবং এসকল অপকর্মের সহযোগীতায় থাকতেন শরীফের পুরো পরিবার। যেমন চাঁনমারীতেই শরীফ কর্তৃক তার পরিবারের সহযোগীতায় নাসির-মানিক হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়। এই কিলিংয়ে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে নাসির-মানিক হত্যায় শরীফ পরিবার এবং তার সহযোগী জুয়েল দুটি হত্যাকাণ্ডের মামলাই আসামী হন।
সম্প্রতি নাসির হত্যাকাণ্ডে ১৬৪ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন নাসির-মানিক হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত শরীফ। আর এই জবানবন্দির মধ্যে পুরো পরিবারকে এড়িয়ে জবানবন্দি দেন শরীফ। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নাসির হত্যা মামলায় প্রথমেই গ্রেফতার হন শরীফের আপন চার ভাই এবং তারা কারাবরণ করছেন। এদিকে এই শরীফসহ অনেকেই এই এলাকায় মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন মাদক সম্রাট বিউটি আক্তার। মাদকের পাশাপাশি এলাকার নানা দিক ও পরিচালনা করেন এই বিউটি।
এ সকল এলাকায় স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এই স্পটগুলো। আশপাশের তরুণদের একটি অংশ এই মাদকচক্রের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে বলেও তারা জানান। তা ছাড়া বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় বিএনপির নাম বিক্রি করে ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে এই বাহিনীর সদস্যরা।
তা ছাড়া আরো অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমঝোতা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, ‘আমাদের পুলিশ সুপার মহোদয় নারায়ণগঞ্জ মাদকসহ সকল প্রকারের অপকর্মের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে তার লক্ষে আমরা প্রতিনিয়ত মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। এবং আমরা প্রতিনিয়ত মাদক কারবারী ও সেবনকারীদের গ্রেফতার করছি। তিনি বলেন, ফতুল্লায় দিনে দিনে অপকর্ম বাড়ছে আমরা সেই বিষয়ে সোচ্চার রয়েছি। অপকর্মকারীরা যাদের শেল্টারে থাকুক না কে পার পাবে না।’