Logo
Logo
×

নগরের বাইরে

মাসদাইরে অপকর্মের নেপথ্যে কারা

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

মাসদাইরে অপকর্মের নেপথ্যে কারা

মাসদাইরে অপকর্মের নেপথ্যে কারা

Swapno



নারায়ণগঞ্জে মাদক বিরোধী অভিযানে গডফাদার ও মাফিয়াদের গ্রেফতার না হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ক্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া এবং তাদের শক্তিশালী গোপন নেটওয়ার্ক। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারায়ণগঞ্জের ২০টি মাদকের বড় স্পটের কথা ক্ষমতায় আসার আগে বললে ও তা এখন প্রায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে ফতুল্লার মাসদাইর এখন আর সাধারণ মানুষের এলাকা নয় এটি কার্যত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে।


বিশেষ করে মাসদাইর যেন আইনের বাইরে এক আলাদা রাষ্ট্র, যেখানে প্রশাসনের উপস্থিতি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে চলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নির্দেশ" তাদের কথাই যেন আইন চট্টগ্রামের আলোচিত 'জঙ্গল সলিমপুর'-এর সঙ্গে এখন সরাসরি তুলনা টানা হচ্ছে মাসদাইরের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গেলে উল্টো হামলার শিকার হচ্ছে, গুলির মুখে পড়ছে। প্রকাশ্যে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, আর পরে তা ধামাচাপা দিতে চলছে নানা নাটক।


শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ফতুল্লার মাসদাইর এখন অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত। কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তাণ্ডব, মানকের অব্যব বিস্তার, জমি দখলের উন্মাদ প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ কার্যত জিম্মি। এই মাসদাইরে শুধু মাদক ব্যবসা নয় চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, মাদক ও ইন্টারনেট-ক্যাবল ব্যবসা নিয়ে অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকেও। গত দুই বছরে মাসদাইরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের ধরতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। সব মিলিয়ে এখন মাসদাইর যেন হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গল সলিমপুর। যেখানে অপরাধীদের বাহিরে অন্য কারো কিছুই চলেনা।


পুলিশের ভাষ্য জানা গেছে, গত ১৩ জুন রাতে মাসদাইরের পেতঙ্গার মোড় এলাকার সন্ত্রাসী ফাইটার মিনেরর আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে ফতুল্লা থানা পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হলে আসামী ছিনিয়ে নিতে পুলিশের উপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় চার থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলির শব্দও শোনা যায়।


এর আগে ৫ মে দুপুরে মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় মাদক সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এসে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন তিন র‌্যাব সদস্য। এ সময় র‌্যাব সদস্যদের প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।


গত ২০২৫ সালের ১৬ মে মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে মাদক কারবারিরা। সেই গোলাগুলিতে পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারী গুলিবিদ্ধ হন। এর কিছুদিন আগে মাসদাইর বাজার এলাকায় এক বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। একের পর এক এই হামলা ও গুলির ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী জাহিদ এবং তার সহযোগীদের নাম উঠে আসছে।


গত ২৩ মে রাতে মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চশমা সাব্বির বাহিনী। দাবি পূরণ না হওয়ায় তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে কুপিয়ে আহত করা হয়। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে সাব্বিরের বাড়িতে পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ অভিযান পরিচালিত হলে তাকে পাওয়া না গেলেও বাসা থেকে দেশীয় অস্ত্র, চকলেট বোমা, ড্রোন, সিসি ক্যামেরা, ৩ হাজার পিস ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ।


স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর মাসদাইরে বর্তমানে তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাদক ব্যবসার নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে। মাদকের সরবরাহ থেকে শুরু করে বিক্রি; সবই নিয়ন্ত্রণ করে এই তিন চক্র। এলাকাভিত্তিক ভাগ করে নিজেদের কারবার পরিচালনা করেন তাদের প্রধানরা। ফারিয়ার মোড়, গাইবান্ধা বাজার, ঘোষেরবাগ, লিচুবাগ ও গলাচিপার কিছু অংশে মাদক বিক্রির নিয়ন্ত্রণ জাহিদের হাতে।


মাসদাইর বাজার, বেগম রোকেয়া স্কুলের মোড় ও ছোট কবরস্থান এলাকায় মাদকের বড় ডিলার কসাই সেলিম। আর গুদারাঘাট, হাজীর মাঠ ও মিস্ত্রীবাগ এলাকা রয়েছে সাঁঝবর ওরফে চশমা সাঁঝবরের দখলে। তবে সম্প্রতি চাঁদাবাজির মামলায় আদালতে জামিন চাইতে গিয়ে গ্রেফতার হন চশমা সাঁঝবর। মাদক ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসার আধিপত্য নিয়েও এলাকায় প্রতিনিয়ত সংঘাত লেগেই থাকে।


২০২৩ সালে মাসদাইরের সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ইফাদুর রহমান তুষারের বাড়িতে হামলা চালায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাফেল প্রধানের অনুসারীরা। তুষার ছাত্রলীগের আরেক নেতা বাশীরের অনুসারী হিসেবে মাসদাইরের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কিন্তু প্রভাব বিস্তার করে রাফেল তার ব্যবসা দখল করে নিতেই সেদিন হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন তুষার।


এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসা নিয়ে এখনো মাসদাইরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া এই মাসদাইর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে মাসদাইরে সর্বশেষ এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় সিজান নামের এক যুবককে বাসা থেকে তুলে এনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয় যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। কিন্তু এসব ঘটনার পরও অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বরং আরও বেপরোয়া।


মামলা হলে ও ইমন হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে বাদীর বাসায় ঢুকে কুপিয়ে, গুলি ছুড়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। এতে স্পষ্ট এলাকায় আইন নেই, আছে শুধু সন্ত্রাসীদের শাসন। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান দিলে ও রাগবোয়াল ধরতে ব্যর্থ হয়ে পরছেন। যাকে ঘিরে অপকর্ম শেষ হচ্ছে না। বর্তমানে মাসদাইরকে ভয়ঙ্কর রূপে পরিণত করতে পেছনে কারা শেল্টার দিচ্ছেন অপকর্মকারীদের সেটা তদন্ত করে বেড় করলেই অপকর্ম কমানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করছে নগরবাসী। তা ছাড়া এই মাসদাইর নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনের অন্তভুক্ত আসন হলেও তিনি এই মাসদাইরের ক্ষেত্রে কেন নিশ্চুপ এমন প্রশ্ন উড়ছে।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন