মাসদাইরের পুলিশের অভিযান, আটক ৫
মাসদাইরের আলোচিত ‘জঙ্গল সলিমপুরে’ আস্থানা গেঁধে বসেছে একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। মূলত মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করেই এই এলাকায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী সংলগ্ন এনায়েত নগর ইউনিয়নের শ্রমিক অধ্যুষিত ঘোষেরবাগ, ফারিয়ার মোড় ও গুদারাঘাট এলাকা মাসদাইরের সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এর বাইরে লিচুবাগ, গলাচিপা, বোয়ালিয়া খাল, তালা ফেক্টরির মোড় এবং নাসিকের আওতাধীন মাসদাইর বাজারসহ আশপাশের এলাকাগুলোতেও অপরাধ থামছে না। যাকে ঘিরে কিছুদিন পরপরই নানা ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে এলাকাবাসী।
একই সাথে পুলিশ-প্রশাসন ও নিয়মিত দিচ্ছেন একের পর এক অভিযান। এদিকে গতকাল (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় ফতুল্লা থানা পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে গাঁজাসহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এই মাসদাইরে শুধু মাদক ব্যবসা নয় চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, মাদক ও ইন্টারনেট-ক্যাবল ব্যবসা নিয়ে অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকেও। গত দুই বছরে মাসদাইরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের ধরতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা। সব মিলিয়ে এখন মাসদাইর যেন হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গল সলিমপুর। যেখানে অপরাধীদের বাহিরে অন্য কারো কিছুই চলেনা।
এ সময় র্যাব সদস্যদের প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৬ মে মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে মাদক কারবারিরা। সেই গোলাগুলিতে পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারী গুলিবিদ্ধ হন। এর কিছুদিন আগে মাসদাইর বাজার এলাকায় এক বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। একের পর এক এই হামলা ও গুলির ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী জাহিদ এবং তার সহযোগীদের নাম উঠে আসছে। গত ২৩ মে রাতে মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চশমা সাব্বির বাহিনী।
দাবি পূরণ না হওয়ায় তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে কুপিয়ে আহত করা হয়। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে সাব্বিরের বাড়িতে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযান পরিচালিত হলে তাকে পাওয়া না গেলেও বাসা থেকে দেশীয় অস্ত্র, চকলেট বোমা, ড্রোন, সিসি ক্যামেরা, ৩ হাজার পিস ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর মাসদাইরে বর্তমানে তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাদক ব্যবসার নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে। মাদকের সরবরাহ থেকে শুরু করে বিক্রি; সবই নিয়ন্ত্রণ করে এই তিন চক্র। এলাকাভিত্তিক ভাগ করে নিজেদের কারবার পরিচালনা করেন তাদের প্রধানরা। ফারিয়ার মোড়, গাইবান্ধা বাজার, ঘোষেরবাগ, লিচুবাগ ও গলাচিপার কিছু অংশে মাদক বিক্রির নিয়ন্ত্রণ জাহিদের হাতে। মাসদাইর বাজার, বেগম রোকেয়া স্কুলের মোড় ও ছোট কবরস্থান এলাকায় মাদকের বড় ডিলার কসাই সেলিম।
আর গুদারাঘাট, হাজীর মাঠ ও মিস্ত্রীবাগ এলাকা রয়েছে সাঁঝবর ওরফে চশমা সাঁঝবরের দখলে। তবে সম্প্রতি চাঁদাবাজির মামলায় আদালতে জামিন চাইতে গিয়ে গ্রেফতার হন চশমা সাঁঝবর। মাদক ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসার আধিপত্য নিয়েও এলাকায় প্রতিনিয়ত সংঘাত লেগেই থাকে।
২০২৩ সালে মাসদাইরের সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ইফাদুর রহমান তুষারের বাড়িতে হামলা চালায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাফেল প্রধানের অনুসারীরা। তুষার ছাত্রলীগের আরেক নেতা বাশীরের অনুসারী হিসেবে মাসদাইরের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কিন্তু প্রভাব বিস্তার করে রাফেল তার ব্যবসা দখল করে নিতেই সেদিন হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন তুষার।
এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসা নিয়ে এখনো মাসদাইরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া এই মাসদাইর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।


