‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে যুবক সিজানকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে গতকাল (৫ জুলাই) বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন নিহত সিজানের মা। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা এলাকায় পরিদর্শন করতে গেলে আহাজারি করতে করতে সিজানের মা বলতে থাকেন, ‘বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার সময় তাঁরা বলে, এক লাখ টাকা দেন, আমরা বিচার কইরা ছাইড়া দিমু ।
তারা আমার পোলারে আমার চোক্ষের সামনে মাইরা এক লাখ টাকা চাইছে। আমি কইছি, আমার পোলাডারে মাইরেন না, আমি আফনেগো এক লাখ টাকা জোগাড় কইরা দিমু, যেমনেই পারি। আমি দিতে পারি নাই দেইখা, আমার চোক্ষের সামনে আমার বাবাডারে মারছে।’
এদিকে এঘটনায় এখন দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন ফালাহ নামে স্থানীয় একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সংগঠক ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম কাওছার আহমেদ। শনিবার রাত ১০টার দিকে পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে বেঁধে সিজানকে বেধড়ক পিটুনি দিলে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
সিজানের বাবা ইউনুছ ওরফে ইনু মিয়া অভিযোগের তীর তাঁর দিকে। কাওছার আহমেদের নেতৃত্বে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি সিজানকে মারধর করে। তিনি বলেন, এলাকার সম্প্রতি একটি সংগঠন করেছেন একটি মসজিদের ইমাম কাউছার। তার ভাষ্য, এর আগেও এলাকার অনেক যুবককে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছেন ওই সংগঠনের সদস্যরা। শনিবার (৫ জুলাই) রাত ৮টার দিকে কাউছারের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জন কিশোর ও যুবক তার ছেলে সিজানকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যান।
পরে মাসদাইর মোড়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। তার অভিযোগ, সিজানের ডান পায়ে পাইপ দিয়ে আঘাত করে ভেঙে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়লে কাউছার তার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে বলেন। পরে খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অভিযুক্ত মসজিদের ইমাম কাউছারের দাবি, সিজানের বিরুদ্ধে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তাকে বাসা থেকে আনা হয়েছিল বোঝানোর জন্য, যাতে সে খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়। তবে ওই সময় কিছু উত্তেজিত লোকজন তাকে পিটুনি দেয়। তার দাবি, যারা পিটুনি দিয়েছে তারা তার লোক নয়।
এদিকে, ঘটনার পর রবিবার (৫ জুলাই) ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে কাওছার আহমেদকে বলতে শোনা যায়, ‘যার কাছে যা আছে তা নিয়ে নেমে যেতে হবে। ঐক্য থাকলে, বাংলাদেশের প্রশাসন কি, কোনো কুত্তায়ও আমাদের কিছু করতে পারবো না। পাবলিক যদি কোনো কুত্তার মেরে ফেলে তাহলে কি অন্যায় হবে? ইনশাল্লাহ কোনো মামলা হামলা কিচ্ছু হবে না। এভাবে সবাই এক থাকবেন।”
স্থানীয়রা জানান, কয়েক মাস আগে পশ্চিম মাসদাইরের আল ফালাহ মসজিদের নামানুসারে ‘আল ফালাহ’ নামে একটি সংগঠন গঠন করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি ওই মসজিদের ইমাম কাওছার আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক এনায়েতনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জুম্মান। সংগঠনটি মাদক, চুরি ও ছিনতাই প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল বলে দাবি করা হয়।
এলাকাবাসী জানান, সংগঠনটির সভাপতি কাওছার আহমেদকে তারা দীর্ঘদিন ধরে উগ্র মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি হিসেবে চেনেন। একই সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জুম্মানের বিরুদ্ধেও এলাকায় নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মাদকসেবনের দাবি করে কিছু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সিজানের মৃত্যুর পর সংগঠনের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করা জিলানী ফকিরের বিরুদ্ধেও ফতুল্লা মডেল থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
এদিকে ৫ জুলাই ‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যার অভিযোগের ঘটনায় অভিযুক্ত ‘আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠন’ পাল্টা বক্তব্য দিয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছে। সংগঠনটির দাবি, বিক্ষুব্ধ বহিরাগত জনতার হাত থেকে সিজানকে উদ্ধার করে সুস্থ অবস্থায় তার মায়ের কাছে মুচলেকা রেখে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
রবিবার বিকেলে সাংবাদিকদের ডেকে পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় আল ফালাহ সংগঠনের নেতা ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম মুফতি কাওছার কাসেমী বলেন, ‘নিহত সিজান এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারী ছিলেন এবং তার কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ ছিল। তাকে সংশোধনের জন্য আগে বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ‘বায়তুস সাকাফাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠন’-এর সহযোগিতায় তাকে ৪০ দিনের চিল্লাতেও পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু ফিরে এসে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’
কাওছার কাসেমীর দাবি, শনিবার সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সিজানকে ধরে তাদের কাছে নিয়ে আসে। এ সময় তারা নামাজ শেষে বিষয়টি দেখার কথা জানিয়ে মসজিদে গেলে উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে। পরে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং তাকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তার মা অনুরোধ করায় মুচলেকা নিয়ে সুস্থ অবস্থায় তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, সিজানের কাছে তখন সুইচ গিয়ার ও মাদকদ্রব্য পাওয়া গিয়েছিল। তার মৃত্যুর পর সংগঠনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
সংগঠনের নেতা জিলানি ফকির সাহেব বলেন, “সিজানকে মারধরের যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে তাদের কোনো সদস্য জড়িত ছিলেন না। তারা তখন নামাজে ছিলেন এবং বহিরাগত ক্ষুব্ধ লোকজনই মারধর করে থাকতে পারে।”
এদিকে, সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, সিজানকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বড় ভাই বাবুর নেতৃত্বে একটি কিশোর গ্যাং তাদের কার্যালয় ও আশপাশের দোকানপাটে ভাঙচুর চালায়। এর প্রতিবাদে তারা এলাকায় মিছিলও করেন।’ সংগঠনের নেতারা দাবি করেন, ‘তারা সবসময় আইন মেনে কাজ করেন এবং অতীতে অপরাধীদের ধরেও পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছেন। এ ঘটনায়ও একই চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানান তারা। একইসঙ্গে সঠিক তদন্তের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।’
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম জানান, ‘মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, “কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা রুজু করা হবে।’
সর্বশেষ রবিবার (৫ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ফতুল্লা মডেল থানায় অবস্থান করেন নিহত সিজানের মা। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।