চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যতই প্রভাবশালী ব্যক্তি হোক না কেন কেউই এর আওতার বাইরে থাকবেনা। এবার তার এক ঝলক প্রত্যক্ষ করলো দেশবাসী। শক্ত অবস্থান থেকে বাদ যায়নি নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজদের বরপুত্র এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খায়রুল ইসলাম সজীবও। চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি অভিযোগ তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয় ।
এর পর নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়কের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় যুবদল। একই দিনে রাত দেড়টায় মুচলেকা নিয়ে তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এমপিপুত্র সজীবের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ছিল আগে থেকেই। প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে স্থানীয়রা কখনোই তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস করেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন যুবদল নেতা খায়রুল ইসলাম সজীব জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আজহারুল ইসলাম নির্বাচিত হওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন সজীব।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সিদ্ধিরগঞ্জ আদমজী ইপিজেড, কাঁচপুরের বিসিক, সোনারগাঁ এলাকার ইকোনমিক জোন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাট-ঘাট-মাঠ সবক্ষেত্রে এমপি পিতার প্রভাব আর যুবদলের পদের বদৌলতে দখলে নেন সজীব ও তার লোকজন। এনিয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ জুন সিদ্ধিরগঞ্জে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের দখল করে এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নানের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে স্থাপনের সাইনবোর্ড টানানো হয়। যেখানে নারায়ণগঞ্জের ৫টি সংসদীর এলাকার এমপির ছবি টানানো ছিল। পরে এনিয়ে বিতর্ক উঠলে কেন্দ্রের নির্দেশে ২০ জুন আবার জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড সাটানো হয়।
সোনারগাঁওয়ের স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর এমপি মান্নানের পুত্র সোনারগাঁওয়ের মেঘনা টোল প্লাজায় ৩০ লাখ টাকা লুটপাটের মধ্যে দিয়েই তাদের অপকর্ম শুরু করেন। পরবর্তীতে নানা অভিযোগ উঠে সজীবের বিরুদ্ধে। সোনারগাঁয়ে ৪৩ টি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির মহোৎসব গড়ে তোলেন সজিবের ক্যাডার বাহিনী।
সূত্র জানিয়েছে, সোনারগাঁয়ে মেঘনা গ্রুপের ৪৩টি ইউনিটের ঝুট টাকা ছাড়াই নিয়ে যায় সজীব। মেঘনা নদীতে রাতের আঁধারে ১৪-১৮টি ড্রেজার লাগিয়ে বালু উত্তোলন করে সজীবের লোকজন। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হাড়িয়া এলাকায় ওয়াশারের জমির মাটি স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সজীবের লোকজন কেটে নিচ্ছে। সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ও সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে সজীব। এছাড়া উপজেলার অর্ধশত অবৈধ চুনা কারখানা তার নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয়রা জানান, ৫ আগস্টের পর মামলা বাণিজ্যে অঢেল টাকা হাতিয়ে নেয় সজীব।
স্থানীয়রা জানান, তৎকালীন সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি বর্তমান এমপি মান্নানের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে ছেলে সজিবই সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁয়ের সবকিছুর নিয়ন্ত্রন করেন একটি বিশাল সিন্ডিকেট নিয়ে। মান্নানের শেল্টারে শুধু তার ছেলের বিভিন্ন খাত থেকে মাসে আয় কোটি কোটি টাকা। এই বিশাল সিন্ডিকেটের অপকর্মের বিরুদ্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে একের পর এক অভিযোগ ওঠে। এছাড়া সোনারগাঁয়ে ৫ আগস্টের পর থেকে মেঘনা নদীতে পলিথিন জাকিরের নৌপথের চাঁদাবাজি একাই নিয়ন্ত্রণ করেন সজিব।
২০২৪ এর ৫ আগস্টের সোনারগাঁওয়ের প্রতিটি ইউনিয়নের মেম্বারদের বিশাল অর্থের বিনিময়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার নেপথ্যে ছিলেন যুবদল নেতা সজিব। তাঁর নিজ এলাকার পিরোজপুর ইউনিয়নের মমতাজ মেম্বারের বাড়ি দখল করে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে। পরে এনিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতাজ। পরে হুমকি-ধমকি দিয়ে তাকে চুপ করানো হয়।
সজীবের এসব কাজে বাহিনীর মূলক নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন বিএম ডালিম, মাসুম বিল্লাহ, পিএস সেলিম হোসেন দিপু, গোলজার হোসেন। নির্বাচনের পর সিদ্ধিরগঞ্জ অংশে এককভাবে ট্রাকস্ট্যান্ড, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড, বাস টার্মিনাল, কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশন, আদমজী ইপিজেড, পদ্ম-মেঘনা তেলের ডিপো, সাইলোসব কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন সজীব।
বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে জানিেেছন, নির্বাচনের আগে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দেন সজীব। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, ‘অধ্যাপক দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’ স্লোগান দিয়ে মশাল মিছিল বের করে সজীব। এর মধ্যে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে নিয়েও নানা কটূক্তি করেন সজীব। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে এমপি ও তাঁর পুত্রের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি নেতাদের কোনঠাসা করতে নানা কৌশল করেন। বিএনপি নেতা এবং যুবদলের কর্মীরও ক্ষুব্ধ ছিলেন এমপিপুত্রের কুকর্মে।
এরআগে ২১ জুন সন্ধ্যায় সজীবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার বিষয়টি জানায় পুলিশ সদর দপ্তর। দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় ছিলেন সজীব। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী। তিনি বলছিলেন, ‘বিকাল ৫টার দিকে সজীবকে আনা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। তার বিরুদ্ধে আছে চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি অভিযোগ।
’ রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে যুবদল। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, নানা অনিয়মে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-আহ্বায়ক খায়রুল ইসলাম সজীবকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এমপি ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃতদের অপকর্মের দায় নেবে না দল। যুবদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশও রয়েছে সেখানে।