Logo
Logo
×

আদালতপাড়া

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি’র দুই পক্ষের হাতাহাতির ভিডিও ভাইরাল

আইনজীবীদের লঙ্কাকাণ্ড

Icon

লিমন দেওয়ান

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

আইনজীবীদের লঙ্কাকাণ্ড

আইনজীবীদের লঙ্কাকাণ্ড

Swapno


# এ ঘটনায় আমি মামলা করবো : পিপি জাকির
# আমাকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছে : প্রশাসক সাখাওয়াত
# ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন : সভাপতি হুমায়ূন
# ২ ঘন্টা অবরুদ্ধ রাখলে ক্ষমা চেয়ে বের হন সাখাওয়াত : আনোয়ার প্রধান


নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির (বার) ভবনে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের দু’টি পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, কালিবাজার নতুন ভবনে কোর্ট স্থানান্তর, নির্বাচনী কমিটির প্যানেল বিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সুমনকে চেয়ারে বসানোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন বিরোধ চলছিলো দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে। সেই বিরোধের জের ধরেই তর্কাতকির সূত্রে পাল্টাপাল্টি দফায় দফায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। গতকাল মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটায় জেলা আইনজীবী ভবনের দ্বিতীয় তলায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের উপস্থিতিতে এই ধরনের ঘটনা ঘটে।


এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক নয়নসহ উভয়পক্ষের কয়েকজন আহতও হন। তারা স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সঙ্গে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে সভাপতির রুমে দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ করা হয়। পরে পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। একই সাথে দুই পক্ষের ফোনে কোর্টে বহিরাগতদের আসতে দেখা যায়। একই সাথে সেখানে বিভিন্ন্ পক্ষের একাধিক যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা গেছে।


সে সময় প্রশাসক সাখাওয়াতকে অবরুদ্ধ রেখে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ তার প্যানেলের নেতারা সে সময় আনোয়ার প্রধানের স্লোগানে শোনা যায়, প্রশাসক সাখাওয়াত স্বৈরাচার, পুলিশের চামড়া তুলে নিব আমরা। এমন ঘটনায় সেদিন রাতে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হূমায়ূন সমিতির সাধারণ সম্পাদক সমর্থিত আইনজীবীদের দায়ী করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় রাজনৈতিকভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।


উভয়পক্ষের আইনজীবীরা জানান, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের চেম্বারে আইনজীবীদের নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয়। বিপরীতে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের পক্ষে অন্য আইনজীবীদের নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয়। আর এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের আইনজীবীরা মুখোমুখী অবস্থানে ছিল। এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান আদালতে প্রবেশ করেন এবং আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের চেম্বারে বসেন।


এসময় বিপরীত পক্ষে থাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের লোকজন থেমে থেমে চিৎকার-চেঁচামেচি এবং হৈ-হুল্লোড় করতে থাকে। পরবর্তীতে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এগিয়ে গিয়ে বিপরীতে থাকা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরকে জিজ্ঞাসা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। এসময় তাদের সঙ্গে যোগ দেন অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধান। সেই সঙ্গে আইনজীবীরা একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে যান। সর্বশেষ উভয়পক্ষই আলাদা আলাদাভাবে জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলোচনা করে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেন।


তা ছাড়া আরো জানা যায়, জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে দু’টি গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এইচএম আনোয়ার প্রধান ও পিপি আবুল কালাম আজাদ জাকির, নয়ন একটি গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন, অন্যদিকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ন কবির, অ্যাডভোকেট হাজী জাকির হোসেন, আইনজীবী নেতা গোলাম মোর্শেদ গালিব অপর গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তা ছাড়া দীর্ঘদিন যাবৎই দুই গ্রুপের মধ্যে কমিটি, ভাগভাটোয়ারা, বিভিন্ন্ বিষয় নিয়ে নানা দ্বন্দ্ব প্রকাশে আসে।


পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ জাকির অভিযোগ করে যুগের চিন্তাকে বলেন , সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুসারীরা তাদের ওপর হামলা করেছেন। এতে তার হাতের একটি আঙুল ভেঙে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘আজ যে ঘটনা ঘটেছে, তা নারায়ণগঞ্জের জন্য দুঃখজনক। সাখাওয়াত সাহেব গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পর গত ২ থেকে ৩ মাস যাবৎ নারায়ণগঞ্জ কোর্টকে দুই ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন। আজ এ নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম। এমন সময় তার লোকজন আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে।’


তিনি আরো বলেন, আনোয়ার প্রধানের আহ্বানে আমরা দুপুরে লাঞ্চ করে সকলে মিলে গল্প করছিলাম। সে সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন সাহেব উনার বডিগার্ড পুলিশ নিয়ে উত্তেজিত অবস্থায় প্রশ্ন করে আমরা কেন হৈ চৈ করছি। তখনই আমি বললাম আমাদের এখানে আজকে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান ছিল তাই হৈ চৈ করছিলাম। তখনই তিনি উত্তেজিত হয়ে আমার গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেছে। তার সাথে থাকা পুলিশ আমাকে কয়েকটি ঘুষি মেরেছে এর মধ্যে একটি ঘুষি লেগে আমার হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে যায়।


তিনি বলেন, আমার হাতের আঙ্গুলে আঘাত লাগলে সেখানে থাকা আমার সহকর্মী আইনজীবীরা সাখাওয়াত সাহেবের সেই বডিগার্ড পুলিশকে আটক করার চেষ্টা করেছে। পরে তিনি সাখাওয়াত সাহেবের সঙ্গে গিয়েই প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে আশ্রয় নেয়।


তিনি আরো বলেন, গত ২ থেকে ৩ মাস যাবৎ নারায়ণগঞ্জ কোর্টকে দুইভাগে ভাগ করা নিয়ে নানা আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনের মধ্যে এড. সাখাওয়াত সাহেবের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিলো আপাতত ৪ থেকে ৫টি কোর্ট পুরান কোর্টে চলে যাবে। তা ছাড়া একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক আইনজীবী যিনি ২০২৪ সালে নারায়ণগঞ্জ বারের সদস্য হয়েছিল সুমন। এই নব্য একজন কোনভাবে নারী ও শিশু আদালতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। যা নিয়ে আইনজীবীরা ক্ষুদ্ধ হলেও তা পাত্তা না দিয়ে প্রশাসক সাখাওয়াত সাহেব ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে গিয়েছে সেখানে ও তারা তাকে বসানোর আশ্বাস ও দিয়েছে। কিন্তু আমরা তা মানতে নারাজ তা নিয়েও একটি বিরোধ রয়েছে।


তিনি বলেন, তা ছাড়া হঠাৎ সাখাওয়াত সাহেব উত্তেজিত হয়ে আমাদের উপর অতর্কিত আক্রমন করলো। উনার মতো দায়িত্বশীল ব্যাক্তির কাছ থেকে আমরা এই রকম কিছু আশা করি না। তা ছাড়া আমার উপর কেন আক্রমন করা হলো সেই বিষয়ে আমি এসপি সাহেবের সঙ্গে কথা বলবো। উনি যদি মামলা না নেয় তাহলে কোর্টে গিয়ে মামলা করবো।


নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, যারা এগুলো করেছে তারা নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। এখানে কারও ইন্ধন আছে, কারও ইন্ধনেই এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। আমাকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছে। আমার সিকিউরিটির দায়িত্ব আমাকে প্রটেক্ট করা। সে তার দায়িত্ব পালন করেছে। সে কারও সাথে দুর্ব্যবহার করেনি। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজও আছে।


তিনি বলেন, আজকের বিষয়টি বিব্রতকর ঘটনা। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তারা নিজেদের চিনতে ভুল করেছে। আমি নারায়ণগঞ্জ বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এমন অযথা অবস্থা তৈরি করা কারও জন্য সুখকর না। তারা নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছে।


তিনি আরও বলেন, আমি আজকে এসে সভাপতির রুমে বসেছি। তারা নাস্তার ব্যবস্থা করেছে। নাস্তা খেতে বসবো এমন সময় শুনলাম পাশের রুম থেকে বকাঝকা আসছে। আমি বের হলাম সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে। সেখানে গিয়ে দেখি তারা মারমুখী। তারা নানান কথাবার্তার অবতারণা করেছে যার কোন ভিত্তি নেই।


নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ূন কবির বলেন,  নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অ্যাডভোকেট সুমন মিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হলেও সাবেক পিপি খোরশেদ মোল্লা কক্ষ তালাবদ্ধ রেখে তাকে সেখানে বসতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।


তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা সিটি প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আনোয়ার প্রধানের কক্ষ থেকে কয়েকজন আইনজীবী মন্তব্য ও হইচই শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।’


সাখাওয়াত হোসেন খানকে অবরুদ্ধ করা কিংবা তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে এমন প্রচার সঠিক নয় বলেও দাবি করেন হুমায়ুন কবির। তাঁর অভিযোগ, আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন সভাপতি। অন্যথায় রাজনৈতিকভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।


নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান বলেন, বারে আইনজীবীদের সভা চলাকালীন সময়ে দলবল নিয়ে সাখাওয়াত ঘটনাস্থলে হঠাৎ উপস্থিত হলে আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুককে শার্টের কলারে ধরে মারধর করেন সাখাওয়াত। এ ঘটনার পরে উত্তেজিত আইনজীবীরা সাখাওয়াতকে অবরুদ্ধ করে।


তিনি বলেন , আমরা আইনজীবী সমিতির ভবনে আমার সাধারণ সম্পাদকের রুমে যখন দুপুরের খাবারে ব্যাস্ত ছিলাম। তখন সাখাওয়াত হোসেন খান সাহেব, আজীজ মোল্লা ও কথিত পুত্র সাইদুল দুই চারজন আইনজীবী নিয়ে আমাদের রুমে প্রবেশ করে আমাদের গালিগালাজ করে এবং এক পর্যায়ে আমাদের পিপি ওমর ফারুক নয়নের গায়ে হাত তোলেন। এসময় আমরা প্রতিবাদ করলে তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং সভাপতির রুমে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে আমরা তাকে দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখি। পরে তিনি ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেন।


তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আইনজীবীরা বারবার দুইটি কোর্ট একসাথে রাখার দাবী জানিয়ে আসছি। তিনি এর বিপক্ষে। কালীরবাজার কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেসি কোর্ট স্থানান্তরের চেষ্টা তিনি করছেন। আমরা যখন এ আন্দোলনটাকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা যেন আইনজীবীদের একত্রিত করতে না পারি সেজন্য তিনি এই অপমান অপদস্ত করেছেন। এছাড়াও একজন পিপি যিনি এপয়েন্টেড না তাকে বসানোর জন্য তিনি এ কাজটি করেছেন। আমরা আজকের এ ঘটনার পরে আগামীকাল সিআর ফাইল করবো।’

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন