নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড অবরোধ করে বিক্ষোভ করার সময় গার্মেন্টসের শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই পুলিশসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। এরআগে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য হিউম্যান চেইন করে ব্যারিকেড দিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও তা ভেঙে শ্রমিকরা গতকাল দুপুর ২টার দিকে মূল সড়কে উঠে আসেন। বিকেল সাড়ে ৪টার পর থেকে লিংকরোডের শিবু মার্কেট, ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকা, জালকুড়িতে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় শ্রমিকরা লিংকরোডের পাশ পড়ে থাকা ঝুটের বর্জ্য কুড়িয়ে এনে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘ শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। বর্তমানে সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।’ এরআগে (৩ নভেম্বর) দুপুর আড়াইটায় ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকার আবীর ফ্যাশন, মেট্রো নিটওয়্যার, মাইক্রো ফাইবার ও আজাদ নিট কম্পোজিটের শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। তারা পুলিশী বাধা উপেক্ষা করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় সড়কে যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। সোমবার একই স্থানে বিক্ষোভ করেছিলেন ফতুল্লার শ্রমিকরা।
এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য হিউম্যান চেইন করে ব্যারিকেড দিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও তা ভেঙে শ্রমিকরা মূল সড়কে উঠে আসেন। এরপরই ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার দিকে শিবু মার্কেট এলাকা থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। যান চলাচলও শুরু হয়।
জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শ্রমিকরা সকাল থেকে না নামলেও দুপুরের পরে নেমে এসেছেন। তাদের শান্ত করতে পুলিশ সদস্যরা চেষ্টা করলেও তারা ব্যারিকেড ভেঙে মূল সড়কে উঠে পড়ে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় শ্রমিকরা। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ওই এলাকায় মোতায়েন ছিল। বিজিবির অন্তত চার প্লাটুন সদস্য মোতায়েন ছিল। এর আগে সকাল থেকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও বিজিবির সদস্য মোতায়েন দেখা যায়। চাষাঢ়ায় বিকেএমইএʼর কার্যালয়ের সামনেও পুলিশ পাহারা ছিল। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ও মিছিল ও কয়েকটি পয়েন্টে অবস্থান নিতে দেখা যায়। কোর্টের সামনে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি আবুল কালাম। তার সঙ্গে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপি নেতা মাসুকুল ইসলাম রাজীব। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদও নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রথমে আদালতপাড়ায় এবং জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তার সঙ্গে ছিলেন নাসিকের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানসহ দলীয় নেতাকর্মীরা। এছাড়া অবস্থান নিয়ে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও বিএনপি নেতা মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
এদিকে, দুপুরে স্থানীয় শিল্পকারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করার জন্য নানা ধরনের চক্রান্ত শুরু হয়েছে। শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন করা। সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এরপরও কিছু কুচক্রী মহল শ্রমিকদের সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ তাঁদের কাছে এসেছে বলেও জানান তিনি।
বিক্ষোভের পর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পিকআপ ট্রাকে করে লাঠিসোঁটা হাতে একদল যুবককে আন্দোলনস্থলের দিকে নেওয়া হচ্ছে। ভিডিও ধারণকারী এক যুবকের গলায় ইউরোটেক্স নিটওয়্যার নামের একটি পোশাক কারখানার পরিচয়পত্র ঝুলতে দেখা যায়। কারখানাটি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার কুতুবপুর এলাকায় অবস্থিত। ভিডিওতে পিকআপে থাকা অন্য ব্যক্তিরা ওই কারখানার শ্রমিক কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের আন্দোলনস্থলে পাঠানোর উদ্দেশ্য নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের শ্রমিক না হওয়ার সন্দেহের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
শ্রমিক আন্দোলনের শুরু থেকেই এতে বহিরাগতদের ইন্ধন থাকার অভিযোগ করে আসছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীরা বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ের সামনে অবস্থানকালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম বলেন, ‘গত কয়েকদিন যাবৎ দেশের আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন করতে দোসর ও গুপ্তরা বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে ঘিরে পাঁয়তারা করছে। শ্রমিকেরা খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের আন্দোলন দিয়ে কিছু যায় আসে না। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নামে যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে তারা শ্রমিকদের কেউ না। তারা এই সরকারকে আনস্টেবল করার জন্য ও দেশকে হুমকির মুখে নিয়ে যেতে পায়তারা করছে। এখানে সাধারণ শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই।’
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব বলেন, ‘গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করতে বিভিন্ন গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে। আন্তর্জাতিক অনেক দেশও তৎপর কীভাবে বাংলাদেশের এই বাজারটাকে ধ্বংস করা যায়। তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায়। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নামে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের অপতৎপরতা দেখে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারও করেছে। একারণে বিষয়টি অনেক যৌক্তিক।’
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ বলেছেন, ‘এসপি সাহেব ডিসি সাহেবসহ আমরা শ্রমিকদের সাথে কথা বলেছি। এখানে কেউ কেউ স্যাবোটাজ করার চেষ্টা করছে, পেছন থেকে ইন্ধন দেয়ার চেষ্টা করছে। এটা নিয়ে এসপি সাহেব ডিসি সাহেব কাজ করছেন। কারা এগুলোর সাথে জড়িত তা খুঁজে বের করা হয়েছে এবং হচ্ছে।’


