Logo
Logo
×

নগর জুড়ে

চাঁদা-শেল্টারে বেপরোয়া হকাররা

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

চাঁদা-শেল্টারে বেপরোয়া হকাররা

চাঁদা-শেল্টারে বেপরোয়া হকাররা

Swapno



# বিএনপি'র নেতাকর্মীরাই হকার বসিয়ে চাঁদা তুলছেন

# উচ্ছেদ কর্মীরা চাঁদার বিনিময়ে হকারদের সুবিধা দিচ্ছেন



নগরবাসীর অন্যতম বিষফোঁড়া হিসেবে পরিচিত হকার সমস্যার সমাধান নিয়ে ফের জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে নাসিক প্রশাসকের হুঁশিয়ারিকে পাত্তা না দিয়েই ফুটপাত দখলে রেখেই নিয়মিত ‘চোর পুলিশ খেলা’ শুরু করেছে হকাররা। অভিযোগ রয়েছে বিএনপি'র অনেক নেতাকর্মীরাই হকার বসিয়ে হকারদের থেকে নিচ্ছেন সুবিধা। যাকে ঘিরে নগরবাসীকে অস্বস্তি¡ দিতেই দিচ্ছেন শেল্টার। সেই সুবাদে উচ্ছেদে ও কর্ণপাত নেই হকারদের।


এদিকে সিটি কর্পোরেশনের হকার উচ্ছেদের জন্য যেই উচ্ছেদ কর্মী পাঠানো হয় তারাও হকারদের থেকে সুবিধা নিচ্ছে। ফলে অভিযানের পূর্বেই তারা খবর পেয়ে যাচ্ছেন এবং সাময়িক সময়ের জন্য রাস্তা ফাঁকা রাখছেন। এদিকে যেহেতু হকাররা নেতাদের বা উচ্ছেদ কর্মীদের চাঁদা দিচ্ছে তাই তাদের সাহসও বেড়ে যাচ্ছে। সেই চাঁদার সাহসেই প্রকাশ্যে নাসিক প্রশাসকের উপর হামলা করতে নিয়েছিলেন হকাররা নামক সন্ত্রাসীরা। এদিকে হকাররা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে এতোই মূল্যবান ও নিরাপদ।


যাকে ঘিরে নাসিক প্রশাসকের উপর হামলার চেষ্টায় ও নেই কোন অভিযোগ বা মামলা। এদিকে বেপরোয়া হকারদের কারণে দিনের পর দিন নগরবাসি থেকে শুরু পথচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া শহরের সড়ক দিয়ে চলাচল করতে না পাড়ায় ব্যবসায়ী নেতারা বিব্রত বোধ করেন। তাছাড়া হকারর এখন নগরবাসির জন্য বিষফোড়া হয়ে দাড়িয়েছে। তার মাঝে ফুটপাতের হকারদের থেকে চাদাঁবাজির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিএনপির একটি অংশ তাদের থেকে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন দেয়ার নাম করে চাদাঁ নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যার একটি অংশ প্রশাসনের লোকজন পেয়ে থাকে।


এদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া, মিশনপাড়া, গলাচিপা, উকিলপাড়া, গ্রীনলেজ ব্যাংকের মোড়, দুই নম্বর রেলগেট, ডিআইটি, চেম্বার রোড, কালীরবাজার সর্বত্রই হকারের বিস্তার। চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেইট সহ গুরুত্বপূর্ন মোড়ে অন্তত ৮/১০ টি করে অবৈধ স্ট্যান্ড বানিয়ে রেখেছে ইজিবাইকগুলো। ফলে দিনরাত যানজট লেগেই থাকে। আর ফুটপাতগুলো পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হলেও এখন তা হকারদের স্থায়ী দখলে চলে গেছে।


হকাররা এখন বঙ্গবন্ধু মুল সড়ক দখল করে নিয়েছে। যদিও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে সাখাওয়াত হোসেন খাঁন দায়িত্ব নেওয়ার হাকডাক করে হকারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করেন। কিন্তু সেই উচ্ছেদে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. আবুল কালাম সমর্থন দিয়ে অংশ নেন অভিযানে। তবে এই উচ্ছেদ ভালো করে এক মাসও টিকেও নাই। শহরের বিবি রোড ও কালীরবাজার এলাকায় দেখা যায়  ফুটপাতে একটুকু জায়গাও ফাঁকা নেই।


মানুষের চলাচলের জন্য জায়গা না থাকায় নেমে যাচ্ছেন সড়কে। এতে করে সড়কে যান চলাচল করছে ধীরগতিতে। অন্যদিকে হকারদের দাবি, আর্থিকভাবে বিভিন্ন লোকজন ম্যানেজ করেই তারা বসছেন। বিনা পয়সায় বসছেন তাও নয়। মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতার ভাইকে দৈনিক টাকা দিয়ে থাকে তারা। এই টাকার ভাগ রাজনৈতিক নেতা, পুলিশের হাতেও পৌছে যায়।’ অথচ তাদের কারনে পথচারীরা চলাচল করছেন ঝুঁকি নিয়ে। এছাড়া হকারদের সাথে পথচারীদের তর্কবিতর্ক লেগেই যাচ্ছে।


স্থানীয়রা বলছেন, আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের টাকা দিয়ে হকাররা বসতো। তাও মাঝেমধ্যে পুলিশ ও সাবেক মেয়র আইভীর জোড়া জুড়িতে অনেকেই উঠে যেত। কিন্তু ৫ আগস্টের পর আর হকারদের উঠতে হয়না। এখন বিএনপিপন্থি লোকজনকে টাকা দিয়ে স্থায়ীভাবে হকাররা বসে গেছে। কাপড়, জুতা, ফল, ইলেকট্রনিক্স, এমনকি খাবারের দোকানও স্থায়ীভাবে বসেছে ফুটপাতে। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে নামতে হচ্ছে মূল সড়কে। কিন্তু এখন বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে পথচারীরা হেটে চলতে পারে না।


নগর বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর মানুষ যেই আশা আকাঙ্খা করেছিলো এই শহর নিয়ে। তা বাস্তবে হয়নি। উল্টো দখলদারের কবলে চলে গেছে পুরো শহর। দখলদার আর শেল্টারদাতারা নিয়ন্ত্রন করছে পুরো শহরকে। কোটি কোটি টাকা আর কর্মঘণ্টা নষ্ট হলেও কারও কোন নজর নেই। কঠোরতা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।সচেতন মহলের মতে, সবমিলিয়ে ফুটপাত ও সড়ক দখলের এই সংস্কৃতি এখন নগরজীবনের এক ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হয়েছে।


দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে নাগরিক দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাড. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমরা হকারদের উচ্ছেদ করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আবারও হকার উচ্ছেদ করা হবে। কেননা ফুটপাতে হকাররা বসতে পারবে না। তাদেরকে আমরা রেললাইনের সাথে বসার ব্যবস্থা করেছি।

এদিকে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত। গত এপ্রিল মাসে হকার উচ্ছেদে কঠোর ভূমিকা হাতে নেন সিটি প্রশাসক। সে সময় তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য তার রাজনৈতিক সচিবসহ বিএনপি ও বিভিন্ন দলের রাজনৈতিকসহ সামাজিক নেতৃবৃন্দ হকারের বিপক্ষে নানা হুঙ্কার দিলে ও মাঠে নেই কেউ। সে বিষয়কে তোয়াক্কা না দিয়েই মাঠে একই সোচ্চার হয়ে উঠেছেন সিটি প্রশাসক।


এদিকে গত রোববার নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত ও সড়ক হকারমুক্ত রাখতে আবারও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন হকাররা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু এতে ও পিছু ফিরেনি তিনি। হকারের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা পালনের হুঙ্কার দেন। এর আগে শহরের যানজট নিরসনে এবং নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে রিক্সা-অটোরিক্সায় ডিজিটাল নম্বর প্লেট বিতরণ করে শক্ত অবস্থান নেয় নাসিক।


এর সুফলও পাচ্ছে নগরবাসী। বর্তমানে হকার উচ্ছেদে নানামুখী কার্যক্রমও হাতে নেন তিনি। তবে পেছন থেকে একটি মহল কলকাঠি নাড়ালেও ঠিকই গন্তব্যের ঠিক কাছে পৌঁছে গেছেন নাসিক প্রশাসক। এবার আর কথা নয় কাজে প্রমাণ দিতে সকল জুজুর ভয় উপেক্ষা করে নিজেই মাঠে নেমেছেন প্রশাসক। বর্তমানে নিজ দলের নেতাদের সার্পোট না পেলেও নগরবাসীকে নিয়ে একাই চ্যালেঞ্জে লড়ছেন তিনি।


সূত্র জানিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করেও কোনোভাবেই তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া ২নং রেলগেইট থেকে চাষাড়া মহিলা কলেজ পর্যন্ত হকাররা এতটাই উশৃঙ্খল ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ উচ্ছেদ কর্মী, কর্মকর্তা, এমনকি সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক—কারো ওপরই হামলা চালাতে বা চড়াও হতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করে না। সাখাওয়াতের এমন ঘোষণাকে ঘিরেই গত (২৫ অক্টোবর) রাতে হকার উচ্ছেদে মাঠে নামেন নাসিক প্রশাসক ।


এ সময় উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সামনেই লঙ্কাকাণ্ড ঘটানোর চেষ্টা করেন উস্কানিতে নামা একটি হকার নামের শ্রেণি। বিক্ষুব্ধ হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকারী দলের সদস্যদের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান পৌছালে তাকে অবরুদ্ধ করে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করে হকার নামধারীরা। এমতা অবস্থায় অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।


তা ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব নেওয়ার পর শহরের যানজট নিরসন ও ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। পরে হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযানও চালানো হয়। অভিযানের পর কয়েক দিন ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে আবারও হকাররা ফিরে আসেন।


এ অবস্থায় তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য শহরের মূল সড়কের পাশে রেললাইনের খালি জায়গা নির্ধারণ করে সিটি করপোরেশন। সেখানে ইট বিছিয়ে বসার জায়গাও প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু হকাররা ওই জায়গায় যেতে রাজি নন। তাঁদের দাবি, রেললাইনের পাশে দেওয়া জায়গাটি স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নয়। ফলে একদিকে পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তুত জায়গা পড়ে আছে, অন্যদিকে শহরের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হচ্ছে না। সাধারণ মানুষকে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।


‘হকারদের শেল্টারে রাজনৈতিক নেতারা’

সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীদের অভিযোগ, হকারদের একটি অংশ রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় অভিযান চালাতে গিয়ে তাঁরা বাধার মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেন এবং তাঁদের ফুটপাতে বসতে সহযোগিতা করেন। গত ৪ মে চাষাঢ়ায় হকার উচ্ছেদ অভিযানের সময় সিটি করপোরেশনের দুই কর্মচারীকে মারধর এবং তাঁদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হকারদের বিরুদ্ধে।


সর্বশেষ রোববার রাতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। এ ঘটনায় কয়েকজন হকারকে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার তদবিরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে পরে হকার প্রতিনিধিরা থানায়ও বৈঠক করেন। বর্তমানে নাসিক প্রশাসক হকারের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিলে ও এখনো বিশেষ অভিযান আসছে না।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন