ভুল চিকিৎসায় চিকিৎসকের উপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
মানুষ তার পাঁচটি মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। তার মাঝে চিকিৎসা নিয়ে নানা জটিলতায় পড়ে আছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা সেক্টরে টেস্ট বাণিজ্য নিয়ে মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরী হয়ে আছে। টেস্ট বাণিজ্যে সহ চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার শিকার কারণে মানুষ এখন নাজেহাল হয়ে আছে।বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ শহর জেলার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নামসর্বস্ব এ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অধিকাংশেরই নেই বৈধ কাগজপত্র। চলছে সাইনবোর্ড ও ভাড়া নেওয়া দু-একটি কক্ষের ওপর নির্ভর করে। এসব প্রতিষ্ঠানে চলে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা। ঘটছে রোগীর মৃত্যুসহ নানা দুর্ঘটনা।
জেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথ্যমতে নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২শ’ ডায়াগনস্টি সেন্টার,প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল রয়েছে। যাদের মূল বাণিজ্য হলো চিকিৎসার নামে টেস্ট বাণিজ্যের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া। তার মাঝে ভুল চিকিৎসার অভিযোগের শেষ নেই। কয় দিন পর পর অমুক ক্লিনিক তমুক ক্লিনিকে ভুল অপারেশনে রোগি মারা গেছে। পরে তা টাকার বিনিময়ে সমাধানও হয়ে যায়। আবার কিছু ঘটনায় মামলাও হয়। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে ভুলচিকিৎসার অভিযোগে রোগি মারা গেছে তা যেন হরহমাসেই ঘটে যাচ্ছে। এই ঘটনায় ক্লিনিক মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার তা আরু বড় আকার ধারন করেছে।
গত ২৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ময়না ক্লিনিকে জন্ম নেওয়া ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার অবহেলার অভিযোগ তুলেছে পরিবার। শিশুটির বাবা মো. হোসেন রয়েল (২৮) জানিয়েছেন, ক্লিনিকের মালিক চিকিৎসক ময়না বেগমের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ভিযোগে রয়েল উল্লেখ করেন, জন্মের পর শিশুটি কান্না করতে থাকলে চিকিৎসক ময়না বেগমকে বিষয়টি জানানো হয়। তবে শিশুটির কোনো সমস্যা নেই বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। শনিবার সকালে কান্না বেড়ে গেলে আবারও ফোনে জানানো হয়। নার্সদের চিকিৎসক ডাকার অনুরোধ করেও সাড়া পাননি বলে দাবি করেন রয়েল। অভিযোগ অনুযায়ী, ময়না বেগম ফোনে নার্সদের শিশুটিকে অক্সিজেন দেওয়ার নির্দেশ দেন। অক্সিজেন দেওয়ার পর কান্না বন্ধ হয়ে গেলে রয়েল উদ্বিগ্ন হয়ে বিষয়টি জানান। তখন শিশুটিকে দ্রুত মাতুয়াইল হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নিহত শিশুর পিতা রয়েলের দাবি, শনিবার দুপুর ১টার দিকে মাতুয়াইল হাসপাতালে পৌঁছালে সেখানকার চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা আগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানান। বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আলাউল কবির দিপু জানান, সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “সিভিল সার্জনের কল পেয়ে এসেছি। তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হয়েছে। যতটুকু শুনলাম, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কিছুটা অবহেলা আছে।”
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জামাল উদ্দিন বলেন, “ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয়দের মতে, তাছাড়া ক্লিনিকটির লাইসেন্স নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই দিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটীতে মেরি স্টার নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় সুমা আক্তার (৩৫) নামে প্রসূতি ও তাঁর গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গত ২৩ অক্টোবর দুপুরে হাসপাতালে নেওয়ার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওই নারীর মৃত্যু হয়।
ঘটনাস্থলে যাওয়া ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিলন ফকির জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে যান। সেখানে একজন ওয়ার্ডবয় ছাড়া কোনো চিকিৎসক বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে পাননি।
নিহতের স্বজনদের বরাতে তিনি জানান, প্রসবব্যথা উঠলে দুপুর ২টার দিকে সুমাকে তাঁর ননদ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। স্বজনদের অভিযোগ, প্রসবের আগেই গর্ভের শিশুটি মারা যায়। এ সময় সুমার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। চিকিৎসকেরা রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
২৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডে প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালে ডাক্তার নাজমুল হোসেন এবং নার্সদের ভুল চিকিৎসা শিশুর মৃ/ত্যুর প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধ করে। নিহত ভুক্তভোগির মা বলেন,ঠান্ডা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে ঠান্ডার রোগ সারাতে গিয়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তাহলে তারা কেন সেখানে ভর্তি রেখে হাসপাতালে থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলো। এছাড়া মানববন্ধনে অন্যান্য বক্তারা বলেন, প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালটি কসাই খানায় পরিনত হয়েছে। প্রশাসন তাদের নিয়ে নিরব থাকে।
প্রশাসন নীরব থাকায় দিনদিন এসব ক্লিনিক মালিক বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তাঁদের দাবি অপচিকিৎসা আর হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হোক। এছাড়া ভুল চিকিৎসার কারনে ভালো চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষ। জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম সাখাওয়াতের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনকল রিসিভ করেন নাই।


