নারায়ণগঞ্জ মূলত তার ঐতিহাসিক ও আধুনিক ব্যবসার জন্য ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ এবং বাংলাদেশের ব্যবসায়িক হাব হিসেবে পরিচিত। এই শহরে বস্ত্র, সুতা, পাট, এবং হোসিয়ারি শিল্পের মতো বড় বড় ব্যবসা রয়েছে। এই বাণিজ্যেক ব্যবসার পশাপাশি বর্তমানে হড়েক রকমের মাদক ব্যবসা ও অপরাধী কর্মকাণ্ডে পরিচিত লাভ করেছে জেলাটি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, সংঘবদ্ধ কারবারিদের দৌরাত্ম্য, কিশোর-তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার এবং মাদককে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা অপরাধ সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে ৭টি থানা, এসপি অফিস, পুলিশ লাইন্স মিলিয়ে ২২০০ পুলিশ সদস্য কর্মরত রয়েছে। যা আয়তন হিসেবে অনেকটাই কম বলে গন্য হচ্ছে। যাকে ঘিরে আইশৃঙ্খলা অবনত চরম আকারে রূপ নিয়েছে। যাকে ঘিরে গত গত ৮ মাসে নারায়ণগঞ্জের ৯৬ জন খুন ও ১০ বার হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ। যা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলে ও নতুন এসপি দায়িত্বে আসার পর থেকে গত ২ মাস যাবৎ পুলিশের উপর হামলার ঘটনা নেই বললেই চলে। কিন্তু মাদকের তৎপরতা কমছে না। এদিকে ইতিমধ্যে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ মাসে মাদক ও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান দিয়ে ৩৮৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়, ২৬৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা রজু রয়েছে। ১০৩ কেজি গাঁজা ও ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে প্রায় ২০ হাজার পিছ। এ ছাড়া অন্যান্য মাদকদ্রব্য ও পাওয়া গেছে। কিন্তু মাদক থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জকে।
এদিকে গত মাসে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটি মিটিংয়ে নারায়ণগঞ্জে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশনাসহ দলের কেউ যুক্ত থাকলে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তা ছাড়া একই মাদকের স্থানে বার বার পুলিশের অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু এতে অভিযান দৃশ্যমান হলে ও মূল আসামীরা টার্গেটের না থাকায় অপরাধ ও মাদক ব্যবসা বৃদ্ধিরই পথে। বর্তমানে যা ’রেড জোনে’ পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক নজরদারির কিছুটা শিথিলতার সুযোগ নিয়ে মাদক চক্রগুলো আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকাগুলো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের অবাধ বেচাকেনা। এদিকে নির্বাচনের পূর্বে নারায়ণগঞ্জের এক জনসামাবেশে ২০টি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত আখ্যা দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী নারায়ণগঞ্জের চিহ্নিত ২০টি মাদকের স্পট নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের মাদকের বিষফোঁড়া হিসেবে ২০ টি চিহ্নিত স্পট রয়েছে সেগুলো হলো- ফতুল্লার চানমারী, মাসদাইর, শহরের জিমখানা র্যালিবাগান, জল্লারপাড়া, রূপগঞ্জের চনপাড়া, ভূলতা, সিদ্ধিরগঞ্জের বিহারী ক্যাম্প,বন্দরে দড়িসোনাকান্দা (লেঙ্গগা শরীফ ও রেললাইন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন), মাহমুদপুর এবং মদনপুর একাধিক স্পট রয়েছে। তা ছাড়া আড়াইহাজার ও সোনারগাঁওয়ে একাধিক স্পট রয়েছে। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে মাদকের বড় স্পট ২০টির মতোই হবে।
একই সাথে তিনি একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মাদক বিরোধী অভিযান দিয়ে গত ২ মাসে ৩৮৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়, ২৬৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা রজু রয়েছে। ১০৩ কেজি গাঁজা ও ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে প্রায় ২০ হাজার পিছ। এ ছাড়া অন্যান্য মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। এদিকে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পূর্বে নারায়ণগঞ্জের একটি সভায় বলেছিলেন নারায়ণগঞ্জে মাদকের ২০টি স্পট রয়েছে সেই সব মাদকের স্পটগুলোতে আমরা হানা দিচ্ছি। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে নতুন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান স্যারের আসার পরপরই একটি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সহযোগীতায় নতুন একটি সামারী ট্রায়াল শুরু করেছি।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এই মাদক ব্যবসায়ীরা যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন। এই মাদক ব্যবসায়ীদের কোনোভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর এই মাদককে কেন্দ্র করেই সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত এই মাদক ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। কয়েকদিন পরপরই মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান করতে গেলেই তাদের উপড় হামলা করা হচ্ছে। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই নিবাচনের পরপরই এসকল স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবি দিন দিন জোড়ালো হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আর এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদক নিয়ে পরিস্থিতির কতটা উন্নয়ন হয়েছে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু সেই ২০ স্পটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ আসছে না। কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের বাসিন্ধারা মাদকের ‘রেড জোন’ থেকে রক্ষা চায়।
এদিকে বর্তমানে নতুন এসপি হাবিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে মাদকের থাবা থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীকে রক্ষা দিতে নানা পদক্ষেপ ও অভিযান চলমান রয়েছে। তা ছাড়া জানা গেছে মূল আসামীদের টার্গেট করে তালিকায় ও করা হয়েছে বর্তমানে তারা কবে গ্রেফতারে আসে সেই নজরই প্রশাসনের উপর নগরবাসীর।


