Logo
Logo
×

নগর জুড়ে

সেলিনা হায়াৎ আইভীর ফেরা না ফেরার গল্প

Icon

আহমদ তমিজ

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

সেলিনা হায়াৎ আইভীর ফেরা না ফেরার গল্প

সেলিনা হায়াৎ আইভীর ফেরা না ফেরার গল্প

Swapno



নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামীলীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ৩৯১ দিন কারাভোগ করে অবশেষে জামিনে মুক্ত হয়ে তার পৈতৃক ভিটা চুনকা কুটিরে ফিরে এসেছেন। গণমাধ্যমের সাথে তিনি প্রথম প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিচারবিভাগ ও সরকারকে এ জন্যে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সৌজন্যের খাতিরে এটুকুই যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু না তিনি পরক্ষনেই সরকার বাহাদুরকে দেশের সবাইকে নিয়ে দেশপরিচালনার আহবানও জানিয়েছেন। অথচ এখনো তার মাথার উপর হত্যাসহ ১২টি মামলার খড়গ ঝুলছে। রয়েছেন তীব্র গোয়েন্দা নজরদারীতেও।


দেশে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ থাকলেও দল হিসেবে আওয়ামীলীগ এখনও নিষিদ্ধ নয়। ডাঃ আইভী এখনো জেলা আওয়ামীরীগের সহ-সভাপতি হিসেবে বহাল রয়েছেন। পুলিশ যখন বিভিন্ন মামলায় আইভীকে চুনকা কুটির থেকে গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলছে তিনি তখনও স্ববাব সুলভ ভঙ্গিমায় জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে শ্লোগান ধরেছিলেন। এখন তিনি অনেকটা ‘খামোশ’ হয়ে আছেন। তার পরবর্তী কর্মপন্থা কি হবে কিছুই খোলাসা করছেন না। এতে জনমনে কিছুটা রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।

অনেকেই প্রশ্ন করছেন তিনি কি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সমঝে উঠেছেন ? নাকি গোয়েন্দা নজরদারী তাকে আতংকিত করেছে? তিনি জেলে থাকাকালীন কি সরকারের সাথে গোপন সমঝোতায় জামিন লাভ করেছেন ? তিনি কি সরকারকে ‘রিফাইনড’ আওয়ামীলীগ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন  ? তিনি কি শেখ হাসিনার অধীনে আর আওয়ামীলীগ করবেন না ? তিনি কি জামিনের শর্ত ভঙ্গের আশংকায় ভুগছেন ? সর্বোপরি তিনি কি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাবেন ? এই সব প্রশ্ন গুলোর বাস্তবতার সাথে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগের অতীত ইতিহাসের দিকে একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করলে সম্ভবত  এ প্রশ্নগুলোর একটা জবাব পাওয়া যেতে পারে।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচনে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা খোকা মহিউদ্দিন শেখ মুজিব দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে ডা. আইভীর পিতা আলী আহম্মদ চুনকা মনোনয়নকে চ্যালেঞ্জ করে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। আওয়ামীলীগ বনাম আওয়ামীলীগের সেই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ‘এলিট’ শ্রেণী খোকা মহিউদ্দিনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের সংখ্যা গরিষ্ঠ ভোটাররা গণ-মানুষের নেতা আলী আহম্মদ চুনকাকে ভোট দিয়ে বিজয়ীকরেছিল।
 
মূলত: এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ দক্ষিণের নেতা চুনকা ও আর উত্তরের নেতা শামীম ওসমানের পিতা একেএম শামসুজ্জোহার নেতৃত্বে দৃশ্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। একই ভাবে ওসমান পরিবারের অভিভাবক শেখ হাসিনা তার প্রিয় শামীম ওসমান কে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন।

ডাঃ আইভী তার মরহুম পিতা চুনকার মতোই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ গ্রহণ করেন। এ নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এড. তৈমূর আলম খন্দকার। সেই নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপি’র দলীয় চেয়ার পারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে গডফাদার শামীম ওসমানকে ঠেকাও।

অর্থাৎ শামীম ওসমানের চেয়ে ডা. আইভী মন্দের ভালো হিসেবে বিএনপি’র নীরব সমর্থন পেয়েছিলেন। একই ভাবে সেই সময় জামায়াত সহ অন্যান্য দলগুলোও আইভীকে একই কারণে সমর্থন জানিয়েছিল। বিএনপি’র প্রার্থী নির্বাচনে থাকলে আইভী নয় শামীম ওসমানই জয়ী হতেন। ফলে আওয়ামীলীগের দক্ষিনের ভোট পেলেও নির্বাচনে তার বিজয়ী হওয়া বাস্তবেই সম্ভব ছিলনা। এর ফলেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে আইভী বিজয়ী হয়েছিলেন। এ সময় একটি গুঞ্জন ছিল ডাঃ আইভী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বেগম জিয়ার সাথে যোগাযোগ করে নির্বাচিত হলে পরবর্তীতে তিনি বিএনপি’তে যোগ দিবেন।

আওয়ামী শাসনের পনের বছর ধরে ডা. আইভী ও শামীম ওসমানের লড়াইটা কোন আদর্শিক লড়াই ছিল না বরং তাদের পিতৃদেবদের বিভাজনের রাজনীতির ধারাবাহিক তারই নামান্তর ছিল। শামীম এবং আইভী তাদের রাজনৈতিক বলয়ের স্বার্থেই পরস্পর বিরোধীতায় লিপ্ত ছিলেন। বাহ্যত ডা. আইভী শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।

প্রশ্ন জাগে শামীম ওসমানের সন্ত্রাস মূলক অবৈধ কাজের বৈধতা দানকারী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী আচরনের কোন প্রতিবাদ ডা. আইভী করেছেন কি ? ডা. আইভী ত্বকী হত্যার বিচার চাইলেও যখন শেখ হাসিনার নির্দেশে শামীম ওসমান তথা ওসমান পরিবারকে রক্ষার জন্য ত্বকী হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে হিমাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল-এ ব্যাপারে ডা. আইভীর কোন প্রতিবাদ ছিল কি ?

শেখ হাসিনা তার ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য দূর্নীতি, স্বজন প্রীতি এবং আইন আদালতকে কব্জায় নিয়ে দেশে গুম, খুন ও জুডিসিয়াল কিলিং এ উন্মত্ত হয়ে দেশে এক দলীয় দুঃশাসনের মাধ্যমে দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সৃষ্টি করে নিরীহ ছাত্র-জনতার উপর হত্যা যজ্ঞ শুরু করেছিলেন। অবশেষে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ইতিহাসের সাক্ষ্য কোন স্বৈরাচারই তাদের পুরানো বয়ানে ফিরে আসতে পারেনি। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশে এক অপ্রাসঙ্গিক অধ্যায় হয়ে গেছেন।

ডাঃ আইভী আগামী সিটিকর্পোরেশন এর মেয়র নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা এ ব্যাপারে তার সামনে দুটি বাধা রয়েছে। প্রথমত: তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১২ টি মামলার মধ্যে যদি অন্তত একটি মামলায় তাকে দু’বছরের অধিক কারাদন্ড দেয়া হয়, তাহলে তিনি আগামী পাঁচ বছর কোন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।


দ্বিতীয়ত; ইলেকশন কমিশন যদি কোন প্রার্থীর আমল নামায় আওয়ামীলীগের সাথে তার কোন বর্তমান বা অতীতে কোন সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমন আইন তৈরী হচ্ছে।


অনেকের ধারণা ডা. আইভী অবশেষে দেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে চলে যাবেন। তবে আমার বিশ্বাস তিনি যদি দেশ ছাড়েন তবে তার গন্তব্য ভারত নয় পশ্চিমের কোন দেশে তার প্রিয়জনের কাছেই তিনি চলে যাবেন।


বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বাংলা দৈনিকে একটি কলাম লিখেছিলেন। তার শিরোনাম ছিল‘ পরিবর্তনে পরিবর্তনীয়’। অর্থাৎ দেশে যখন কোন ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে যায় তখন বৃদ্ধি মানের কাজ হচ্ছে সেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করে পূর্বের অবস্থান ত্যাগ করে নতুনের পথে, মানুষের কল্যাণের পথে অগ্রসর হওয়া। সেই পরিবর্তনটি রাজনৈতিক কিম্বা বুদ্ধি বৃত্তিক যাই হোক না কেন।  লেখক : আইনজীবী/সাংবাদিক।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন