নগরীর বিবি রোড, শায়েস্তা খাঁ রোড, চেম্বার রোডের ফুটপাত দখল করে হকারদের দুর্বিষহ যন্ত্রনা থেকে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে ও জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি হকারদের জীবিকা সুরক্ষায় শহরের দুই নম্বর গেইট থেকে চাষাঢ়া মহিলা কলেজ পর্যন্ত রেললাইনের এক পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ীভাবে হকারদের স্থানান্তরে কাজ করছে নাসিক। ইতিমধ্যে রেললাইনের পাশে ময়লারস্তূপ ভেকু দিয়ে পরিষ্কার করে বাঁশের বেড়া লাগিয়ে সেখানে ইটের সলিংয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নাসিক।
যাকে ঘিরে আগামী মাসের মধ্যেই হকাররা নতুন জায়গায় স্থানান্তর হবে। এদিকে বর্তমান কাজ শেষ হলে প্রথমে প্রকৃত হকারদের তালিকা প্রস্তুত করে নির্ধারিত স্থান বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নাসিক প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান। এর পাশাপাশি তিনি আরো জানিয়েছেন, বিগত দিনে যে ৬৭২ জনকে তালিকা করে ফুটপাত থেকে হর্কাস মার্কেটে স্থানান্তর করা হয়েছিলো বর্তমানে নতুন পুনর্বাসনে স্থান পাবে না। যাকে ঘিরে আলোচনা উঠছে সেই ৬৭২ জনের দোকান কোথায় দেওয়া হবে। তারা কি এই দাবি মেনে ফুটপাত ছাড়বে কিনা সে বিষয়ে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এর আগে সাবেক সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, এই হকার্স মার্কেটের দোকান বরাদ্দের নামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। হকারদের নামে বরাদ্দকৃত ৬৭২টি দোকান নামে-বেনামে বরাদ্দ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সেসব দোকান চড়া দামে বেচে দিয়ে এখন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমনই একজন হকার্স নেতা রহিম মুন্সী এখন নারায়ণগঞ্জ শহরে পাঁচতলা বাড়ির মালিক। এ ছাড়া অন্যান্য হকার্স নেতাও নামে-বেনামে বরাদ্দ পাওয়া সব দোকান বিক্রি করে অর্থসম্পদের মালিক হওয়ার পরও ফুটপাতে বসে ব্যবসা করছে। যাকে ঘিরে প্রথম থেকেই হর্কাস মার্কেটে হকার নেই।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৮ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় হকারদের জন্য নবাব সলিমুল্লাহ সড়কের পাশে টিনের ছাউনির আধাপাকা হকার্স মার্কেট তৈরি করা হয়। সেখানে ৬৭২ জন হকারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রত্যেকের নামে দোকানের ভিটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে প্রতি বর্গফুটের জন্য এককালীন ১৬৮০ টাকা এবং মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় দোকানপ্রতি ৬০০ টাকা। মার্কেটে ৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের দোকান রয়েছে ৭৪টি। আর দৈর্ঘ্যে ৩ ফুট ও প্রস্থে ৪ ফুটের দোকান রয়েছে ৫৯৮টি।
এদিকে গতকাল সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে নগরীর চাষাঢ়া থেকে ২ নম্বর রেলগেটের গলাচিপা এলাকায় রেললাইনের পাশের নির্ধারিত স্থানে হকারদের স্থানান্তরের প্রস্তুতি ও সার্বিক কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন নাসিক প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান।
পরিদর্শন শেষে নাসিক প্রশাসক বলেন, এই শহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। সবার স্বার্থ রক্ষা করে একটি সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আপাতত রেললাইনের পাশের খোলা জায়গায় তাদের বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে যাকে-তাকে হকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, প্রথমে আমরা একটি তালিকা করব। প্রকৃত হকারদের শনাক্ত করে তাদেরই স্থান দেওয়া হবে। পূর্বে যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তাদের একইভাবে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হবে না। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বসানো হবে। বিগত দিনে তালিকা হয়ে হর্কাস মার্কেটে স্থানান্তর করা কেউ এই নতুন পুনর্বাসনের জায়গায় স্থান পাবে না।
তিনি আরো নির্ধারিত স্থানের পরিমাপ শেষে প্রতিটি ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা হবে। প্রতিটি স্টলের নম্বর নির্ধারণ করা হবে এবং সেই নম্বর অনুযায়ী হকাররা ব্যবসা পরিচালনা করবেন। জায়গাটি অনেক বড়। পরিবেশ উন্নয়ন করা গেলে ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে আসবেন। সামনের দিকে রাস্তা নির্মাণ করা হবে। এতে হকাররা সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
তিনি বলেন, নগরীর বিবি রোড, সলিমুল্লাহ রোড, শায়েস্তা খাঁ রোডের হকারদের পর্যায়ক্রমে নতুন স্থানে স্থানান্তর করা হবে। এখানে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আপাতত চাষাঢ়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে ইটের দেয়াল নির্মাণ করা হবে, যাতে ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষের কোনো ঝুঁকি না থাকে এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
এর আগে গত (১৩ এপ্রিল) ডাক ঢোল পিটিয়ে শহরকে হকারমুক্ত করে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এড. সাখাওয়াত হোসেন খানের যৌথ উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জের সুশীল-সমাজসহ সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের নিয়ে মাঠে হকার উচ্ছেদ পরিচালনা হয়। এদিকে উচ্ছেদের আগেই হকাররা ফুটপাত ছেড়ে সতর্কস্থানে চলে যায়। যাকে ঘিরে শহরে হকার দেখা না গেলে ও নেতাকর্মীরা শোডাউন দিয়ে বিছিন্নস্থানে হকারদের রাখা মালামাল জব্দ করে।
এদিকে সেই অভিযানে টানা ৬ দিন হকার না দেখা গেলে গত (২০ এপ্রিল) বিভিন্ন্ বাম নেতাদের ছত্রছায়ায় পুনর্বসান ছাড়া হকার উচ্ছেদ মানি না মানবো না। এমন ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে যায় হকাররা। টানা ৩/৪ দিন এমন আন্দোলন করে আবারো ঈদুল আযহার নামে ফের ফুটপাত দখলে নেয় হকাররা। এরপর থেকেই সেই বিগত দিনের মতোই চোর-পুলিশ খেলা চলছে-চলমান। নিয়মিত সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীদের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলেন হকাররা। যাকে ঘিরে এই সমস্যা থেকে নগরবাসীকে পরিত্রান দিতে এবার হকার পুনর্বসানের উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছে সিটি প্রশাসক।
যাকে ঘিরে দ্রুত আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই নতুন স্থানে অস্থায়ী স্থানান্তর হচ্ছে হকাররা। যেখানে স্থান পাবে না কথিত সেই ৬৭২ প্রতারক তালিকাভুক্ত হকার। তা ছাড়া বর্তমানে আলোচনা উঠছে হকারদের যেখানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। সেখানে কি প্রকৃত হকাররা স্থান পাবে কিনা এখানে গত ৫ আগষ্টের পর বিএনপির ট্যাগ লাগিয়ে চাঁদাবাজি করা সেই পুরনো চাঁদাবাজরা টাকার বিনিময়ে নাসিকে প্রভাব খাটিয়ে সেই তালিকায় নিজস্ব টাকা দেওয়া দোকানিরাই স্থান পাবে।