হকার চায় ফুটপাত, চ্যালেঞ্জে সাখাওয়াত-কালাম
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
টানা ১৭ দিন নিয়মিত অভিযান দৌড়ঝাঁপ, ‘চোর পুলিশ খেলা’ এরই মধ্যে ফাঁকা রয়েছে শহরের ফুটপাত। কিন্তু ইতিমধ্যে তৃতীয় বারের মতোই ‘পুনর্বাসনের আগে হকার উচ্ছেদ চলবে না’- স্লোগানে আবারও সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেছে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতগুলো থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকাররা। তা ছাড়া নানান হঙ্কার দিচ্ছেন হকাররা। শহরবাসী নিশ্চিন্তে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলাফেরা পরেছি হুমকির মুখে।
এদিকে দীর্ঘদিন পর স্বস্তি ফিরে আসা নগরবাসীর মন ভাঙতে নারাজ রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ অনেকেই। যাকে ঘিরে এই স্বস্তি টিকিয়ে রাখতে ফুটপাত ফাঁকা রাখার সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থানে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম। বর্তমানে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রয়েছে।
সূত্র মতে, গত (১৩ এপ্রিল) সিটি প্রশাসক-এমপিসহ সকল রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে মাঠে নেমে হকার উচ্ছেদ করেন। কিন্তু সপ্তাহ না পেরুতেই (গান্ধি পোকা) নাম খ্যাত বাম নেতা অঞ্জন-ইকবালরা মাঠে হকারদের সাহস দিয়ে আন্দোলনে নামান। তা ছাড়া দ্রুত পুর্নবাসনের জোরালো দাবি জানান। এর পর থেকেই হকাররা নিয়মিত ফের মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছেন। তা ছাড়া সেই লক্ষে ইতিমধ্যে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়মিত অভিযানসহ সদর থানা পুলিশ অভিযান চালালে নিয়মিতই সেই বিগত আওয়ামী লীগ আমলের ‘চোর পুলিশ খেলা’ চিত্রর দেখা মিলছে। অনেকেই বলছে, এভাবেই ধীরে ধীরে স্থায়ী হওয়ার পথে হকাররা।
অথচ এই ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে তুলকালাম কান্ড দেখেছে নগরবাসী। বিগত ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষে হয়েছে। গোলাগুলি আর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল পুরো নারায়ণগঞ্জ শহর। সংঘর্ষের এক পক্ষে ছিলেন তৎকালীন সিটি মেয়র ডা: সেলিনা হায়াত আইভী আর অন্য পক্ষে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। সিটি মেয়র আইভী চেয়েছিলেন নগরীর ফুটপাত থেকে অবৈধ হকারদের উচ্ছেদ করে দিতে কিন্তু সাংসদ শামীম ওসমান হকারদের পক্ষ নিয়েছিলেন এবং যেকোনো মূল্যে হকারদের ফুটপাতে বসানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। মূলত মেয়র এবং সাংসদের ব্যক্তিগত বিরোধ এবং সমন্বয়হীনতার কারণে নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা যায়নি। তৎকালীন আওয়ামীলীগ হকার নিয়ে রাজনীতি করেছে। তবে ২০২৬ সালে এসে নারায়ণগঞ্জের ফুটপাত হকার মুক্ত হয়েছে। আর এই সফলতার নেপথ্যে রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এবং সংসদ সদস্যের মাঝে চমৎকার সমন্বয়ে আর বোঝাপড়া। নাসিক প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও সাংসদ এডভকেট আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জের সকল দল ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে নগরীর বিষফোঁড়া ফুটপাতের অবৈধ হকার উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এদিকে নাগরিকদের দাবি, তারা নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে চান। তাদের সেই দাবি পূরণ করতে ১৩ এপ্রিল হকার উচ্ছেদ হওয়ার মাধ্যমে সেই দাবী পূরণ হয়। কিন্তু হকারদের উচ্ছেদ করার পর তারা এবার শক্তিশালী হকারদের পক্ষে কোন নেতা না পাওয়ায় তারা তেমন ভাবে পুনর্বাসনের দাবী আন্দোলন জমাতে পারেনি । নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান কঠোরভাবে হকার দমনের ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া এমপি আবুল কালামও হকাররা যেন ফুটপাতে বসতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসনকে। এমনকি নাগরিক সমাজ, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজেরও দাবী শহরের মুল সড়কের ফুটপাতে হকার বসতে না পারে। কিন্তু হকাররা উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ না যেতেই আস্ফালন দেখিয়ে আবারও বসা শুরু করেছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা ও নগরবাসীর নির্বিঘ্নে হাঁটার সুবিধার্থে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। ফুটপাত হকারমুক্ত হকার রাখার সিদ্ধান্তে নগর কর্তৃপক্ষ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছেন।
এদিকে গতকাল বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন হকাররা। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রেখে মিছিল নিয়ে বের হন তারা। জাতীয়তাবাদী হকার ইউনিয়ন দলের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি কেএম মিজানুর রহমান রনির নেতৃত্বে শতাধিক হকারদের মিছিলটি শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক প্রদক্ষিণ করে। একইসঙ্গে তারা শায়েস্তা খাঁ সড়কেও বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সড়কেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের বাসার সামনেও তারা পুনর্বাসনের দাবিতে স্লোগান দেন।
হকাররা বলেন, “আমরা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হকার আছি। আমরা মাত্র তিন থেকে চারশ’ হকার এখানে আসছি। সকলে সকলকে ডেকে নিয়ে আসতে হবে। আমরা যুদ্ধ করবো আর পরে আরেকজন আইসা মজা করবে তা হবে না। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকতে হবে।”
মানবিক দিক বিবেচনা করে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, “আমাদের বাচ্চারাও স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় পড়ে। আমাদের ইনকামেই সংসার চলে। আমাদের বসার ব্যবস্থা কইরা তারপর ফুটপাতের থেইকা আমাদের উঠান। কালাম সাহেবের ছেলে নাকি বলে, তিনি মরনের আগ পর্যন্ত ফুটপাতে হকার বসতে পারবে না। চামড়ার মুখ দিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলে। কিন্তু আমরা চাই, আমাদের একটা ব্যবস্থা অতি শীঘ্রই করে দেন।”
পুর্নবাসনের আগে হকারদের উচ্ছেদ না করার দাবি জানানোর পাশাপাশি পুনর্বাসন নিয়ে পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়ার আগ পর্যন্ত সড়কের ফুটপাতে বিকেল পাঁচটার পর থেকে বসারও দাবি জানান হকাররা। তারা বলেন, “আমাদের দেশে রোহিঙ্গাদের সরকার পালে কিন্তু আমরা দেশের নাগরিক হইয়াও আমাদের কোনো মূল্য নাই। আমাদের দুঃখ যদি কেউ বুঝতো তাইলে আমাদের কষ্ট করতে হতো না। ওনারা তো ছোটবেলা থেকে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হইছেন। ওনারা আমাদের দুঃখ বুঝবো না। এই জুলাই যুদ্ধে হকাররাও সংগ্রাম করছে। কিন্তু আজকে হকারের কোনো মূল্য নাই। আমাদের উচ্ছেদ না করে আমাদের বিকেল পাঁচটা থেকে বসতে দেন।”


