Logo
Logo
×

নগর জুড়ে

ফাঁকা ফুটপাতের ভিন্ন শহর

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

ফাঁকা ফুটপাতের ভিন্ন শহর

ফাঁকা ফুটপাতের ভিন্ন শহর

Swapno

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের পর গত কয়েকদিন ধরেই চলছিল এক চাপা উত্তেজনা। সংঘাতেরও আশঙ্কা করেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই হকাররা ‘রণে ভঙ্গ দেওয়ায়’ জটিলতা পোহাতে হয়নি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের। প্রায় বিনা বাধাতেই হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।


এদিকে, সকাল থেকেই ফাঁকা ফুটপাত পেয়ে স্বস্তিতে চলাচল করতে পেরেছে নগরবাসীর। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি সাধুবাদও জানিয়েছেন তারা। দাবি করেছেন, এই ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। কোনোভাবেই যেন ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হাঁটার পথ বাধাগ্রস্ত না হয়। তবে, তা কতদিন ধরে রাখা যাবে সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে।


রাজধানীর পাশে অবস্থিত শিল্পসমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম সমস্যা- হকারদের ফুটপাত দখল। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোটারদের চাহিদার মধ্যে অন্যতম ছিল- হকারমুক্ত ফুটপাত। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে এই দাবি আরো জোরালো হয়। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও সিটি প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নেন। বসেন জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথেও। গত শুক্রবার রাজনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সাখাওয়াত হোসেন।


ওই বৈঠকে সকলেই হকারমুক্ত ফুটপাতের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসেন এবং ১৩ এপ্রিল হকার উচ্ছেদে অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও এর আগেও একাধিকবার এই শহরের ফুটপাতে হকারদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সীমিত কিছু সময়ের জন্য হকারমুক্ত ফুটপাত থাকলেও তা আর টেকসই সমাধান হয়নি। এমনকি ২০১৮ সালে এই হকার ইস্যুকে কেন্দ্র রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ওই সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।


তিনিও রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক প্রতিনিধি ও সুধী মহলের সঙ্গে বসে অন্তত বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত সাধারণ নগরবাসীর চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ান সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি হকারদের পক্ষ নিয়ে নগরবাসীর আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। হকার ও শামীম ওসমানের অনুসারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন খোদ আইভীসহ অর্ধশতাধিক মানুষ।


এরপর হকার নিয়ে চলে ‘ইদুর বেড়াল’ খেলা। প্রশাসনের অভিযানে হকাররা পালিয়ে যেতেন আবার ফিরে আসতেন কিছুক্ষণ পর। এভাবে কয়েকবছর চললেও গণঅভ্যুত্থানের পর হকারদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যায়। শহরে হকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এমনকি বেড়ে যায় ফুটপাতে চাঁদাবাজিও।


এমন পরিস্থিতিতে সোমবার নারায়ণগঞ্জ নগরীর ব্যস্ততম তিনটি সড়কে অবৈধ হকার উচ্ছেদে অভিযানে নামে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। এতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সদস্যরাও সহযোগিতা করেন। শহরকে ‘গ্রিন ও ক্লিন’ করার লক্ষে সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগে সোমবার (১৩ এপ্রিল) দিনভর ফুটপাত ছিল অনেকটাই হকারমুক্ত। বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালিত হয়। তবে অভিযানের খবর আগেই পেয়ে সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু সড়ক, নবাব সলিমুল্লাহ সড়ক ও শায়েস্তা খাঁ সড়কে হকারদের দেখা যায়নি। এতে পথচারীরা নির্বিঘ্নে ফুটপাত ব্যবহার করতে পেরেছেন এবং ব্যস্ততম বঙ্গবন্ধু সড়কে যানজটও তুলনামূলক কম ছিল।


অভিযান ঘিরে বিকেল তিনটায় নগরীর চাষাঢ়া জিয়া হল মিলনায়তনের সামনে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। সিটি প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “নগরবাসীর স্বার্থে শহরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব। ফুটপাতে আর কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। কেউ আইন ভঙ্গের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেন, “জনগণের সমর্থনেই ফুটপাত হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই অবস্থা ধরে রাখতে প্রশাসনকে নিয়মিত তৎপর থাকতে হবে। হকার ইস্যুতে আমাদের জিরো টলারেন্স।” সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, ১৩ এপ্রিল থেকে শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে কয়েকদিন ধরেই মাইকিং ও প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও করা হয়।


অভিযানে অংশ নিতে দুপুরে বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক ও ভেকুসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কর্মকর্তারা চাষাঢ়ায় জড়ো হন। তাদের সঙ্গে র‌্যাব, পুলিশ, স্কাউট সদস্য এবং সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও যানজট নিরসন কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান, সংসদ সদস্য আবুল কালাম এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুর কুতুবুল আলমের নেতৃত্বে ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানের আগেই বেশিরভাগ হকার তাদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ায় উচ্ছেদ কার্যক্রমে তেমন বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে, হকারমুক্ত এই ফুটপাত কতদিন থাকে তা দেখার অপেক্ষায় নগরবাসী।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন