নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দারা এখন দুই শ্রেণির দখলদারের হাতে জিম্মি। যার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারী ও যাত্রীদের। দখলের একদিকে রয়েছে ফুটপাত, অন্যদিকে মূল সড়ক। ফুটপাতজুড়ে হকারদের দখল, অন্যদিকে সড়কে ইজিবাইক ও অবৈধ পরিবহনের দখলে। আর এতে করে যান চলাচলে নিত্যদিন সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও বিশৃঙ্খলা। কিন্তু এবার ভিন্ন আঙ্গিকে নগরবাসি থেকে শুরু করে সর্বময় মহলকে নিয়ে হকার উচ্ছেদে মাঠে নামছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত।
তার সাথে কোন অংশে পিছিয়ে নেই জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ অ্যাড. আবুল কালাম মাঠে থাকবেন। তাছাড়া ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ প্রশাসনের সাথে মিটিং করে হকার উচ্ছেদে মাঠে নামবেন আজ (১৩ এপ্রিল)। কিন্তু প্রশ্ন সকলের কাছ থেকে প্রশ্ন উটেছে হকার উচ্ছেদের পর তা কতদিন স্থায়িকাল থাকবে। তাছাড়া পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী শাসনামলে সাবেক মেয়র আইভী যখন হকার উচ্ছেদে মাঠে নামেন তখন তারই দলের সাবেক সাংসদ গডফাদার খ্যাত শামীম ওসমান বাধা হয়ে দাড়ায়।
তখক হকার নিয়ে দুই ভাই বোনের মাঝে সংঘর্ষ পর্যন্ত বাধে। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা নেই। কেননা এবার এমপি, নাসিক প্রশাসক, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সহ নগরবাসি, সুশিল সমাজ, ব্যবসায়ী সমাজকে নিয়ে হকার প্রতিরোধে মাঠে নামছেন। আর এজন্যই বলা হচ্ছে এবার ভিন্ন আঙ্গিকে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তবে যদিও হকারদের মাঝে বলাবলি হচ্ছে আপাতত কয়দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে।
একই সাথে অপাতত বসা যাবে না। কিন্তু বিগত সময়ে শামীম ওসমানের খলিফা জাকিরুল আলম হকারদের শেল্টার দিতেন, বিএনপি সরকার আসার পরে স্থানীয় ভাবে দলটির মধ্য থেকে কে হকারদের শেল্টার দিচ্ছে তা সকলের জানা থাকলেও তারাই আবার উচ্ছেদ অভিযানে থাকছেন। যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরী উঠেছে এই উচ্ছেদ কতদিন টিকবে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরে ফুটপাত দখল ও হকার সমস্যাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সমাধানের চেয়ে বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিই হয়েছে বেশি। ফলে, এ নিয়ে একাধিকবার সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হাঁটার স্বস্তি পাননি নগরবাসী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের সময়ে শহরে হকারের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু তাদের উচ্ছেদে এবার জোরালো ভাবে তবে নতুন সরকার গঠনের পর এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম।
আজ হকার উচ্ছেদের পর থেকে শহরের প্রধান সড়কে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষনা দিয়েছে নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
অন্যদিকে দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে হকাররা। আগে কেবল ফুটপাতে বসলেও এখন রাস্তারও বড় একটি অংশে চৌকি ও ভ্যানগাড়ি নিয়ে বসছেন হকাররা। বর্তমানে চাষাঢ়া সোনালী ব্যাংক এলাকা থেকে কালীরবাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ কার্যত হকারদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ফুটপাত দিয়ে না হাঁটতে পারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজটে ভোগান্তিও। বিশেষ করে চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই পাশে শতাধিক হকার ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছেন। ফলে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে জটলা, বাড়ছে পকেটমার-ছিনতাইয়ের ঘটনাও।
হকার উচ্ছেদের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি এ সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। হামলায় নেতৃত্ব দেন সেই সময়কার আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমান। ওইদিন আইভী ছাড়াও সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতাসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর স্থায়ীভাবে হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধু সড়ক।
শহরের প্রায় সব সড়কেই হকার বসানোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা-কর্মী এবং সিটি কর্পোরেশনের অসাধু কর্মচারীরা এর সঙ্গে জড়িত। হকারদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয় এবং হকার নেতাদেরও মাসোহারা দিতে হয়। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধেও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নাসিক প্রশাসকের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৩ এপ্রিল শুরু হতে যাচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান। তবে স্থানীয়রা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এটি সহজ হবে না। সব মিলিয়ে ১৩ এপ্রিলের অভিযান নারায়ণগঞ্জ শহরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা- এটি কি স্থায়ী সমাধানের দিকে যাবে, নাকি আবারও পুরনো চিত্রে ফিরে যাবে- সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে।